Banner by Rituparna Chatterjee, a woman with the potential to make it big. It's not that she can't: she just won't.

Saturday, April 12, 2014

আবিষ্কার

অর্কদীপ্ত কহিল, কেন, মহারাজ?

মহারাজ প্রত্যুত্তরে যকৃৎ ও পাকস্থলীর মধ্যবর্তী কোনও অঞ্চল হইতে “ঘুঃ” শব্দ উচ্চারণ করিলেন। অর্কদীপ্ত স্তম্ভিত হইয়া গেল। এরূপ শব্দ সে কখনও শুনে নাই। বস্তুতঃ, রাজবংশে এইরূপ শব্দোচ্চারণের রীতি আছে কিনা, তাহাও তাহার অবগত নহে।

মহারাজ পুনরায় পাদচারণায় রত হইলেন। অর্কদীপ্ত ক্রমেই অধৈর্য হইয়া উঠিতেছিল। মহারাজকে একই প্রশ্ন বারংবার করিলে তিনি অবধারিত বিরক্ত হইবেন; অন্যদিকে, দেবতারা কেন কুপিত, আর সে বিষয়ে তাহাকে কেন মহারাজ গুপ্তমন্ত্রণায় আহ্বান করিয়াছেন, তাহাও উপলব্ধ হইতেছে না।

কোশলের মুখ্য সূপকার অর্কদীপ্ত। পলান্ন ময়ূরসিদ্ধ মধুপর্ক তালক্ষীর দগ্ধ-আম্ররস মিষ্টান্ন পায়স সকলই তাহার নখদর্পণে। গত বর্ষায় সরিষা পিষ্ট করিয়া মৎস্যে মাখাইয়া তাহাকে কদলীপত্রে আদ্যোপান্ত আবৃত করিয়া নূতন যে পদ সে পাক করিয়াছিল, তাহার গুণগান রাজাপ্রজা সকলে করিয়া থাকে। তাহার সহকারীগণ সকলেই তাহাকে গুরুজ্ঞান করে।

এহেন অর্কদীপ্ত রাজসকাশে আসিয়া বড়ই অস্বস্তিবোধ করিতেছিল। মহারাজ যদি কিছুমাত্র কহিতেন তাহা হইলেও তাহার ন্যূনতম জ্ঞানলাভ হইত। এক্ষেত্রে নির্বোধের ন্যায় দণ্ডায়মান থাকিয়াই তাহাকে একপ্রহরকাল অতিবাহিত করিতে হইয়াছে।

মহারাজা অবশেষে কহিলেন, “জানো অর্ক, এ জম্বুদ্বীপে কোশলের ন্যায় রাজ্য বিরল। কোশলের গগনচুম্বী যশ, মান, কৌলীন্য সকলের কারণ ঐ একই – দেবকুলের আশীর্বাদ। দেবতারা আমাদের উপর প্রসন্ন চিরকাল প্রসন্ন ছিলেন।”

“ছিলেন?”

“হাঁ। অদ্য প্রাতঃকালে আমার স্বপ্নে স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র আবির্ভূত হইয়াছিলেন।”

অর্কদীপ্ত ভাবিল, রাজকুলের সকলই তাহাদিগের হইতে পৃথক। তাঁহাদের স্বপ্নেও দেবরাজই দেখা দেন। বৈদ্যের স্বপ্নে হয়ত অশ্বিনীকুমারদ্বয় আবির্ভূত হন, কর্মকারের স্বপ্নে বিশ্বকর্মা, ইত্যাদি। দেবতাদের পাচক কে, তাহা অর্কদীপ্ত ভাবিতে লাগিল।

“দেবরাজ কহিলেন, তিনি কোশলের প্রসাদে সন্তুষ্ট নন।”

“সন্তুষ্ট নন?”

“না। তোমার পাক্‌প্রণালীতে তাঁহারা বিরক্ত।”

“কেন, মহারাজ?”

“তাঁহারা একই খাদ্যের পুনরাবৃত্তি চান না।”

“কিন্তু মহারাজ, কোশল তো চিরকাল দেবভোগে নব খাদ্যতালিকা নির্মাণ করিয়া থাকে।”

“সে বিষয়ে আমি অবগত আছি। কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। দেবতারা আদ্যোপান্ত নূতন পদের সন্ধান করিতেছেন। যাহারা তাঁহাদিগকে নূতন পদের সন্ধান দিবে, তাঁহারা সেই রাজ্যেই অধিষ্ঠান করিবেন।”

“মহারাজ, আপনি আমাকে আদেশ করুন, কদলীপত্রে সরিষাপিষ্টলাঞ্ছিত মৎস্য ভক্ষণ করিলে দেবতারা কখনওই অন্য রাজ্যের কথা স্মরণে আনিবেন না।”

“তুমি যথার্থ কহিয়াছ। তোমার আবিষ্কৃত মৎস্যের পাক্‌প্রণালী সত্যই অভূতপূর্ব। কিন্তু তোমার সহকারী নন্দের কল্যাণে অবন্তীরাজকে তোমার আবিষ্কৃত যাবতীয় পদের সহিত পরিচিত হইয়াছেনমুগ্ধ অবন্তীবাসীগণ তাহাদিগের নূতন মুখ্য সূপকারের গুণপণায় মুগ্ধ। সমস্যা হইল, তোমার যাবতীয় পদ সে দেবতাগণের ভোগে ইতিপূর্বে ব্যবহার করিয়াছে। তাঁহারাও এখন অবন্তীর জয়গানে ব্যস্ত।”

“নন্দ, মহারাজ?” মূর্খশৃঙ্গারকের এরূপ স্পর্ধায় অর্কদীপ্ত স্তম্ভিত হইল।

“এখন উপায়?”

“তুমিই আমাদের একমাত্র সহায়, অর্কদীপ্ত। যদি কেহ কোশলকে দেবকুলের সুনজরে আনিতে পারে, সে কেবল তুমি। কল্য প্রভাতে যখন তাঁহারা কোশলে আবির্ভূত হইবেন তাঁহাদিগের নিমিত্ত এহেন খাদ্য প্রস্তুত করিতে হইবে যাহাতে তাঁহারা কখনও কোশল ত্যাগ না করেন। এরূপ খাদ্য যাহা কেহ ইতিপূর্বে আস্বাদন করে নাই, ভবিষ্যতেও করিবে না।”

অর্কদীপ্ত পড়িল মহা ফাঁপরে। দাড়িম্বরস ও মরিচের প্রয়োগে যে মৃগমাংসের ব্যঞ্জন অদ্য দ্বিপ্রহরে পাক করিবার বাসনা ছিল তাহার। মৃগমাংস মহারানীর বড় প্রিয়

***

রাজপ্রাসাদের প্রশস্ত উদ্যানে শুইয়া ছিল অর্কদীপ্ত। কল্য প্রভাতে তাহার জীবনের বৃহত্তম পরীক্ষা। অদ্য সমগ্র দিবস সে নানান্‌ নূতন পরীক্ষায় নিযুক্ত ছিল, এবং নানান্‌ নূতন আবিষ্কারে কৃতকার্য হইয়াছে। ভর্জিত পার্শ্বমৎস্য যে সর্ষপার স্পর্শে এরূপ সুস্বাদু হইতে পারে, তাহা কে জানিত?

চতুর্দশীর নির্মেঘ নক্ষত্রখচিত গগনে প্রায়-বর্তুলাকৃতি চন্দ্রমা সগৌরবে বিরাজমান। নির্নিমেষ দৃষ্টিতে ঊর্ধ্বপানে চাহিয়া অর্কদীপ্তর তরুণ হৃদয় অস্থির হইয়া উঠিল। অদ্য সে কৃতকার্য হইয়াছে কি? মহারাজ কহিয়াছেলেন, “এমন খাদ্য যাহা কেহ ইতিপূর্বে আস্বাদন করে নাই, ভবিষ্যতেও করিবে না”। সত্য, সে আজ যাহা পাক করিয়াছে তাহা কাহারও রসনাস্পর্শ করে নাই; কিন্তু ভবিষ্যৎ? ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার গর্ভে কোন্‌ মহাপাচক কী প্রস্তুত করিবে তাহা কে কহিতে পারে?

না, তাহাকে অভিনব কিছু করিতে হইবে, যাহাতে তাহার নাম মানবসভ্যতার ইতিহাসে অবিনশ্বর হইয়া থাকে। ব্যর্থ শিল্পীকে কেহ মনে রাখে না; মৃত্যুর পর নিজ পদচিহ্ন রাখিয়া যাইতে কে না চাহে?

কিন্তু কীরূপ হইবে সেই অত্যাশ্চর্য অমৃত, যাহার স্বাদ পরবর্তী যাবতীয় প্রজন্ম মনে রাখিবে?

বসন্তের মৃদুমন্দ সমীরণ অর্কদীপ্তকে শান্ত করিতে অসমর্থ হইলচঞ্চল মশককুলের দংশনও অগ্রাহ্য করিয়া সে স্থিরদৃষ্টিতে তাকাইয়া রহিল। তাহার মৃত্যু হইবে একদিন, কিন্তু এই মহাকাশ, এই সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-নক্ষত্রের বিনাশ নাই। তাহার নামও কালের অনন্ত স্রোতে গ্রথিত রাখিয়া যাইতে হইবে।

এক প্রহরকাল অতিবাহিত হইল। তাহার পর অর্কদীপ্তর চক্ষু নিমীলিত হইল, ওষ্ঠে মৃদু হাসি দেখা দিল।

হাঁ, সে পারিবে।

***

পূর্ণিমার রাত্রি। কোশল আলোকিত করিয়া সূর্যদেব আসিয়াছেন; উচ্চৈঃশ্রবাপৃষ্ঠে আসিয়াছেন স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র; অরণিস্তুপ হইতে আবির্ভূত হইলেন অগ্নিদেব; সরোবরমধ্যে দণ্ডায়মান বরুণদেব; বিশ্বকর্মা ভ্রূকুটি কুঞ্চিত করিয়া প্রাসাদ পর্যবেক্ষণ করিতেছেন; অশ্বিনীকুমারদ্বয় অনিচ্ছুক নাগরিকবৃন্দের মণিবন্ধ পরীক্ষা করিতেছেন; পবনদেবের জন্য ঋক্ষচর্মাবৃত বিশেষ প্রকোষ্ঠ নির্মিত হইয়াছে।

পূর্ণমাসীর রাত্রে চন্দ্রদেবের উপস্থিতির সম্ভাবনা ক্ষীণ ছিল; উন্মুক্ত গবাক্ষপথে তিনি দৃষ্টিপাত করিতেছেন, কিন্তু পঞ্চেন্দ্রিয়র কোনওটির সাহায্যেই তিনি অর্কদীপ্তর সুখাদ্যের আস্বাদ পাইতেছেন না।

মধুপর্কের পর অর্কদীপ্ত একে একে তাহার নূতন খাদ্য উপস্থিত করিল। দুগ্ধফেননিভ সুগন্ধ অন্ন, বার্তাকু সহযোগে ইল্লীশমৎস্যের তরলপ্রায় ব্যঞ্জন, শূকরস্নেহভর্জিত মরালবক্ষপিণ্ড, সুস্বাদু নক্রপক্ষসূপ, সুসিদ্ধ মূষিকজিহ্বা ইত্যাদি নানাবিধ ভুজ্যবস্তুর সুবাসে ভোজনকক্ষ মোহিত। দেবতাগণ কোশলরাজের উপর তৃপ্ত হইলেন।

তখন অর্কদীপ্ত ঘোষণা করিলেন, “অতঃপর যে সুখাদ্য আমি আপনাদিগের স্বর্ণথালিকায় রাখিব, তাহা সমগ্র মানবকুলের ইতিহাসে অভূতপূর্ব। আপনারা ত্রিকালদর্শী। ইহা ভক্ষণ করিয়া অধমকে অবগত করিবেন, ভবিষ্যতে ইহার সমকক্ষ কোনওরূপ খাদ্য মানবজাতি পাক করিতে সক্ষম হইবে কী?”

ক্ষুদ্রপাত্রে ছাগমাংসের ব্যঞ্জন পরিবেশনান্তে অর্কদীপ্ত তাহার নবাবিষ্কৃত আবিষ্কার বৃহদ্‌পাত্রে লইয়া উপনীত হইল। গব্যঘৃতের সুগন্ধে ভোজনকক্ষ ভরিয়া উঠিল। কোশলরাজ স্বয়ং অধৈর্য হইয়া উঠিলেন।

দেবতাগণ তাহাদের দক্ষিণহস্তের সাহায্যে স্বাদগ্রহণ করিলেন। তারপর তাহাদের সমবেত হর্ষধ্বনিতে কোশল হাসিয়া উঠিল। উপস্থিত সকলকে স্তম্ভিত করিয়া দেবরাজ নিজ আসন ত্যাগ করিয়া অর্কদীপ্তকে আলিঙ্গন করিলেন; কোশলরাজের গর্বিত অভিব্যক্তি অবলোকন করিয়া সভাসদ্‌গণ নিশ্চিন্ত হইল।

“তিষ্ঠ।”

কোশলের সুবিশাল ভোজনকক্ষে গণপতির কম্বুকণ্ঠ সহসা মন্দ্রিত হইল।

“আমি কোনওরূপ অপরাধ করিয়াছি, প্রভু?” কোশলরাজের অসহায় কণ্ঠে উপস্থিত সভাসদ্‌গণ প্রমাদ গণিল।

“দেখিতেছি এই খাদ্য আস্বাদন করিয়া ইহারা অতিশয় তৃপ্ত। সূপকার, তোমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে ইহা প্রবেশ করে নাই, যে এই খাদ্যের স্বাদগ্রহণ আমার অসাধ্য? আমার এক হস্তে ক্ষুদ্র পরশু, দ্বিতীয় হস্তে পাশ, ও অপর দুই হস্ত নিম্নগামী। শুণ্ড ভিন্ন আমি স্বাদগ্রহণ করিতে অকৃতকার্য। অবশিষ্ট যাহা খাদ্য ছিল তাহা ভক্ষণ করাও অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, কিন্তু তোমার আবিষ্কৃত এই নূতন পদ যারপরনাই শুষ্ক। অতিথির অযোগ্য খাদ্য পরিবেশন অনুচিত, তাহা তোমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে প্রবেশ করে নাই? আমি তোমাকে অভিশাপ দিতেছি যে...”

“... বিনায়ক, আপনার কথা যথার্থ,” ইন্দ্র গণপতির অভিশাপ বিঘ্নিত করিলেন“কিন্তু আপনি অনুগ্রহ করিয়া ইহাকে ক্ষমা করিবেন এই খাদ্য মানবসমাজের ইতিহাসে অমর হইয়া থাকিবে। আপনি এই শিল্পীকে দণ্ডদান করিলে সমগ্র মানবজাতি এই অমৃতের স্বাদ হইতে বঞ্চিত হইবে।”

“ইহা ভক্ষণ করা আপনার অনুচিত হইত,” অশ্বিনীকুমারদিগের একজন (অপরজন লোলুপ দৃষ্টিতে স্বর্ণথালিকা পর্যবেক্ষণ করিতেছিলেন) কহিলেন। “আপনার উদরের যা পরিমাপ, তাহাতে স্নেহজাতীয় খাদ্য আপনার অবিলম্বে পরিত্যাগ করা উচিত। মধুমেহ অত্যন্ত ভয়াবহ ব্যাধি।”

কিন্তু গণপতি অনমনীয়“আমার মুখনিঃসৃত বাক্য কদাপি ব্যর্থ হয় না। অভিশাপ অনিবার্য। আপনাদের অনুরোধে আমি অভিশাপের মাত্রা হ্রাস করিতেছি। এই খাদ্যের মান যতই উন্নত হউক, ইহার স্মৃতি সকলের অগোচর রহিবে। আর এই অর্বাচীনের নাম ইহার সহিত যুক্ত রহিবে না।”

ইন্দ্রদেব কহিলেন, “গণপতির অভিশাপ খণ্ডন আমার সাধ্যাতীতএই খাদ্যের কথা মানবজাতি যথার্থ বিস্মৃত হইবে, কিন্তু দুই সহস্রাব্দকাল অতীত হইলে পুনরায় ইহার প্রত্যাবর্তন ঘটিবে।”

অর্কদীপ্তের অক্ষদ্বয় অশ্রুপূর্ণ করিয়া উঠিল, কিন্তু ক্রমশঃ তাহার হনু দৃঢ়ভাব ধারণ করিল, মুষ্টি ইস্পাতকঠিন হইয়া উঠিল। তাহার নাম অমর না হউক, তাহার আবিষ্কার তো মানবজাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে রচিত হইবে!

দেবরাজের কণ্ঠস্বর পুনরায় মন্দ্রিত হইল: “অর্কদীপ্ত, আমি আশীর্বাদ করিতেছি, তোমার এই আবিষ্কার নবগৌরবে আসীন হইবে। ইহা পুনরায় শ্রেষ্ঠ খাদ্যরূপে পরিচিত হইবে। কোশল ব্যতিরেকে অন্য স্থানেও ইহার পুনরাবির্ভাব ঘটিতে পারে, কিন্তু তাহা জম্বুদ্বীপেই ঘটিবে। ঘৃত মহার্ঘ হইলে কোনওরূপ বীজনিঃসৃত স্নেহজাতীয় পদার্থ দ্বারা ইহা পাক হইবে, কিন্তু তাহাতেও ইহার স্বাদ অক্ষুণ্ণ থাকিবে। গণপতি ব্যতীত আমরা সকলে তোমাকে আশীর্বাদ করিতেছি। তুমি আর কিছু কহিতে চাহ?”

খানিক ইতস্ততঃ করিয়া অর্কদীপ্ত কহিল, “দেবরাজ, চন্দ্রদেব যে আমার রন্ধন স্বাদগ্রহণ করিতে অক্ষম হন, ইহাতে আমার বিবেকদংশনের অবধি থাকে না। আমি প্রার্থনা করি, এই খাদ্য যতকাল প্রশংসালব্ধ হইবে, চন্দ্রদেবের নাম যেন ইহার সহিত জড়িত থাকে।”

“উত্তম। এই খাদ্যের আকৃতি চন্দ্রবৎ হইবে। তুমি ইহার নামকরণ করিয়াছ?”

“না, প্রভু

“সরস্বতী, আপনি ইহার নামকরণ করিতে চান?”


বাগ্‌দেবী গণপতির পানে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিপাত করিলেন, তাহার পর স্বর্ণথালিকার পানে তাকাইয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিলেন“মানবসমাজের খাদ্যরুচির শ্রেষ্ঠ পুরস্কার হইবে এই খাদ্য। ছাগমাংসের সন্নিবেশে ইহা আজিকার ন্যায় অমৃততুল্য স্বাদ লাভ করিবে। কাব্যশাস্ত্র অনুসারে রুচির সহিত অন্ত্যমিল রাখিয়া ইহার যোগ্য নাম হইবে লুচি।”

Monday, March 24, 2014

একজন বং, তার পেন, আর তার সাক্ষাৎকার

"বংপেন" নামটা প্রথম শুনেই আমার গা-পিত্তি জ্বলে গেছিল। একে তো "বং" কথাটা সহ্য হয় না (যদিও গ্রেটবং সেটার মাত্রা খানিকটা কমিয়েছে); তার ওপর ২০১৩র বইমেলায় একটা টপ্‌লেস লোকের ছবি দেখে বইটা কেনারও বিশেষ প্রবৃত্তি হয়নি।

আবার অ্যামাজন থেকে ঝেড়েছি!
কিন্তু তারপর বংপেনের সঙ্গে, মানে, ব্লগটার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হল। চোখের সামনে দেখতে থাকলাম ব্লগার থেকে তন্ময়ের লেখক হয়ে ওঠা। ২০১৩টা ছিল ওর ওয়াটারশেড ইয়ার। আর তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, ২০১৪র বইমেলায় বইটা কিনতেই হবে; না কিনলে জীবন বৃথা।

তন্ময়ের লেখার বৈশিষ্ট্য কী? তন্ময়ের সেন্স অফ্‌ হিউমর অসাধারণ, কিন্তু তার পরিচয় মেলে সোশল নেটওয়র্কে (মূলতঃ ইংরিজিতে), বইয়ে নয়। বইয়ে তন্ময়ের হিউমরে একটা ঈর্ষণীয় পরিমিতিবোধ আছে: হিউমর ব্যাপারটা সবার আসে না, কিন্তু তন্ময়ের সেটা সহজাত; কিন্তু সবথেকে বড় ব্যাপার হল, গল্পের খাতিরে হিউমর কমাতে ও রাজি, কিন্তু উল্টোটা নয়। কোনওরকম বাড়াবাড়ি নেই।

কিন্তু এটাও তন্ময়ের আসল গুণ নয়। ছেলেটা বাচ্চা হলে কী হবে, লেখার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম মায়াবী দিক আছে, আর আছে একটা মারাত্মক মন-খারাপ-করা কষ্টে-দুমড়ে-দেওয়া মধ্যবিত্ত বাঙালিয়ানা; আবার আছে আরেকটা কড়া হাতের থাপ্পড়, যেটা বারবার ঘাড় ধরে ভাবতে বাধ্য করে, একটা জঘন্য অপরাধবোধে দুমড়েমুচড়ে দেয় ভেতরটা। নিজেকে কোনও না কোনও চরিত্রের মধ্যে খুঁজে পেতে বাধ্য হবেন আপনি; অন্যের থেকে লুকোতে পারবেন নিজেকে তখন — কিন্তু নিজের থেকে?

স্থান-কাল-পাত্র কথাটা আমরা দুমদাম বলে থাকি, কিন্তু তন্ময় ব্যাপারটা যত সুন্দরভাবে বুঝেছে ততটা বুঝিনা। শহর থেকে মফঃস্বল থেকে গ্রাম, অতীত-বর্তমানের দুটো-তিনটে প্রজন্ম, আর পাত্রের ব্যাপারটা তো ছেড়েই দিলাম; অদ্ভুত অনায়াস ট্রান্সিশন একটা থেকে আরেকটায়।

কিন্তু এসব যদি নাও থাকত তাহলেও তন্ময়ের লেখা একইরকম উপভোগ্য হত, কারণ বাংলা ভাষায় এত ভয়ংকর সুন্দর (এটা কথার কথা নয়; "ভীষণ সুন্দর" বলতে চাইনি; ভয়ঙ্কর অ্যান্ড/অর সুন্দর বলতে চেয়েছি) ছোটগল্প খুব কমই লেখা হয় আজকাল। তর্‌তরে মেদহীন ভাষা, চমৎকার চরিত্রায়ন, সাবলীল লেখার ভঙ্গি, আর একটা পেট-খালি-করে-দেওয়া ক্লাইম্যাক্স। এই বইটায় ছোটগল্পের সংখ্যা কম (কিন্তু রম্যরচনাগুলো আছে, যেগুলো না পড়ে বাঙালি সাহিত্যপ্রেমী বলে নিজেকে পরিচয় দেওয়ার মানেই হয় না), কিন্তু আশাকরি তন্ময় আর রোহণ "বংপেন ২"এ গল্পের সংখ্যা অনেক বেশি বাড়াবে।

রোহণকে আরেকটা ব্যাপারে ধন্যবাদ। তন্ময় ফেসবূকে আর টুইটারে নানান্‌ অসাধারণ (বলেছিলাম না?) স্টেটাস মেসেজ দেয়, যেগুলো হারিয়ে যায়। রোহণ সেগুলোর থেকে বাছাই করে কয়েকটা বইয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছে। হোক্‌ ইংরিজি, কিন্তু ভাল লেখা তো!

***

অভিযোগ: রোহণ, এই বইটায় ছবি কম কেন? 

***

বোনাস প্রাপ্তি: তন্ময়ের সাক্ষাৎকার। পড়েই দেখুন, বেশ জমাটি ছেলে।

অভিষেক: একদম ব্লগ থেকে তুলে প্রশ্ন করছি: মুখার্জী তন্ময়? সে কে হয়?
তন্ময়: মন দিয়ে চাকরি করি। ঘরকুনো। বিরিয়ানি সত্যিই ভালোবাসি। কলকাতার প্রতি সিনসিয়ার ভালো লাগা আছে তবে আদিখ্যেতা নেই।বাথরুম গাইয়ের ব্যাপারটা নিজেকে ঠাট্টা করে বলিনি; আমি আন্তরিক ভাবে বিশ্বাস করি শাওয়ারের তলায় আমার কণ্ঠস্বর আর পাঁচটা বাঙালির চেয়ে বেশি খোলতাই হয়। ইন্টারনেট আমাদের ক্ষতির চেয়ে উপকার অনেক বেশি করে; এই তথ্য আমি প্রাণপণ পুশ করি। আর আমি বাংলা ব্লগার। 

অভিষেক: হঠাৎ বংপেন নাম কেন?
তন্ময়: বাঙালি ইডিওসিঙ্ক্রেসিগুলো নিয়ে ব্লগ করাই ছিল উদ্দেশ্য। কাজেই ব্লগের নামে বাঙালি বা বেঙ্গলি গোছের কিছু থাকবে, সেটা ভেবে নিয়েছিলাম। আর ব্লগ যখন শুরু করি তখন পোস্ট করতাম রোমান হরফে বাংলা লিখে; সেই রোমান হরফে বাংলার মেজাজটা এই "বং" শব্দটা বেশ সহজে ক্যাপচার করেছিল। এ ছাড়া ব্লগের ইউআরএলএ "বাঙালি"র বদলে "বং"  ব্যবহার করাটা ইকনমাইজিংএ সাহায্য করেছিল।
"বং" ব্যাবহারের আরও একটা স্পষ্ট কারণ আছেই। যা দেখে ব্লগ ব্যাপারটার আদত ব্যাপ্তি মালুম হওয়া; গ্রেট বং ডট নেট। তোমার ব্লগ থেকে তুলে বলতে গেলে “ইট্‌ অল্‌ বিগ্যান উইথ হিম”। সহজ অনুপ্রেরণা। 
পেন কেন জুড়লাম মনে নেই। "বং"এর পর অনেক সাফিক্স হয়তো গূগ্ল অগ্রাহ্য করেছিল “অলরেডি টেক্‌ন্‌” বলে। পেন ছিল। এমন পাতি কারণেই "বংপেন"।  

অভিষেক: মলাটের ভদ্রলোক কে? আলাপ করেছিস্‌? উনি কিন্তু বইয়ের কাটতি বাড়িয়ে দিয়েছেন!
তন্ময়: মলাটের কনসেপ্ট একান্তই রোহণের (প্রকাশক-বাবুটি)। ভদ্রলোক সম্ভবত কুমোরটুলির কারিগর। ওনাকে ঘিরে আমার অনেক অকূলপাথার চিন্তা-ভাবনা। অনেক বেওয়ারিশ-রোম্যান্টিক সব আইডিয়া আছে ওঁর ম্যাদামারা অথচ দাবীময় ইমেজ ধরে। আমি অনেক পোস্ট লেখার চেষ্টা করি যেখানে প্রোটাগনিস্টের মুখ আমি ওঁর মুখের আদলে কল্পনা করি। অ্যাট সাম লেভেল, উনি আমার সুচিত্রা সেন। যাকে শুধু গ্ল্যামারের ফ্রেমে আঁটা যায়, কিন্তু যার পাশে বসে চা-বিস্কুট খাওয়া চলে না। 

অভিষেক: বইয়ে তো নেই, কৃতজ্ঞতার ব্যাপারটা এখানেই সারবি?
তন্ময়: একটা উৎসর্গপত্র বইতে রেখেছি। টু মাই ফ্রেন্ড্‌জ। যাঁদের সাথের গপ্প-আড্ডায় আমার গ্যাঁজানোর দম বেড়েছে। তবে যদি একজনের কথা নির্দিষ্ট ভাবে বলতে হয় তবে সে আমার স্কুলের সহপাঠী সুহেল ব্যানার্জি। আমি আদৌ কোনও রকম লেখালিখিতে কখনোই ছিলাম না। ২০০৬ পর্যন্ত তো নয়ই। কেন ওর মনে হয়েছিল যে আমি ব্লগ করতে পারবো তা ওই জানে। ইন ফ্যাক্ট ব্লগ ব্যাপারটা ওই আমায় প্রথম খোলসা করে বলে। স্পেসিমেন হিসেবে আমায় পড়ায় অর্ণব রায়ের ব্লগ। সুহেলের আইডিয়াতেই ব্লগিংএর শুরু। প্রাথমিক ভাবে ব্লগের সাবজেক্টও ওরই প্রায় ঠিক করে দেওয়া; বাঙালিজ্‌ম। সুহেলের মনে হয়েছিল বাংলা নিয়ে আমি ব্লগোপযোগী হালকা লেখা নিয়মিত লিখতে পারবো। সেই থেকেই বংপেন শুরু ২০০৭এ। আমার ব্লগের প্রথম নিয়মিত পাঠকও ওই সুহেল। তবে ও এত কাছের বন্ধু, “কৃতজ্ঞতা” জানালে প্যাঁক দিতে পারে। 
এছাড়া লেখা ও লেখার মাধ্যম নিয়ে অনেক মানুষ নিয়মিত ফিডব্যাক দিয়েছেন। যেমন ধর রোহণ বলেছিল “ইংরেজি ফন্টে লিখ না, ইউনিকোডে এসো”। এক মুখুজ্জ্যেবাবু আমায় অভ্র ধরিয়েছিলেন। লেখা দরকচা মেরে গেলে অনেকে স্টাইলের ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন, নতুন আইডিয়া যুগিয়েছেন, টিপ্‌স দিয়েছেন।  আমি একটু একটু করে শিখছি। 

অভিষেক: কবে থেকে ভাবতে শুরু করলি যে তোর বই বেরোতে পারে?
তন্ময়: বইয়ের আইডিয়া সম্পূর্ণ ভাবে রোহণের। ব্লগ থেকে যে বই হতে পারে সে ধারণা আমার কোনও দিন ছিলনা।বরং আমি যথেষ্ট সন্দিহান ছিলাম এ ব্যাপারে। ইন ফ্যাক্ট “ব্লগের সাহিত্য”; এ হুজুগটাই একান্ত ভাবে ওর।  

অভিষেক: ছোটগল্পটা তোর বেশ ন্যাচারালি আসে। সংকলন লেখার কথা ভেবেছিস্‌?
তন্ময়: আমি যে কোনও লেখা ব্লগপোস্ট ভেবে লিখি। একটা যে কোনও বিষয় আগে ভেবে নিই। কখনও সেই বিষয়ে সোজাসাপটা লেখা লিখে দি। কখনো প্লট ফেঁদে সে বিষয়টার সম্বন্ধে আমার মতামত বের করে আনার চেষ্টা করি। অর্থাৎ আলুসেদ্ধ কেন আমার ভীষণ ভালো লাগে তা নিয়ে সোজাসুজি প্রবন্ধ গোছের কিছু না লিখে, একজন মানুষ আলু সেদ্ধ খেতে খেতে কেমন মজে গেলেন তেমন একটা ঘটনা তুলে ধরার চেষ্টা করি। বছরখানেক ধরে বিশেষ ফোকাস নিয়ে প্লট ধরে লেখার চেষ্টা করছি। কিন্তু লেখাগুলো মূলত একটা ব্লগ-বিষয় ভিত্তিক; যেমন শীত কেন পড়ছে না, কবিতা আর গোয়েন্দাগিরির পার্থক্য ইত্যাদি। লেখাগুলো প্লট-নির্ভর নয়। সে লেখাগুলোর দৈর্ঘ্যও খাটো। এবং সেগুলো লেখা মাত্রই ব্লগে পোস্ট করে দেওয়ার দুর্বার চাড় আসে; কারণ ব্লগ ভেবেই সেগুলো ফাঁদা। 
এত পাঁয়তারা কষলাম এইটা বলতে যে গল্প সংকলন গুছিয়ে লিখবার স্কিলসেট , ধৈর্য এবং সাহস এখনও ঠিক আয়ত্ত হয় নি। মনে হয়। তবে ইচ্ছে তো হয়ই। 
  
অভিষেক: তোরা সিরিয়াসলি লিখলে বাংলা ভাষাটা ঘুরে দাঁড়াবে বুঝিস্‌?
তন্ময়: বাঙালি যত বাংলা লিখবে, বাংলা ভাষা তত জমাট হবে; এ বিশ্বাস আছে। 

অভিষেক: প্রথম অটোগ্রাফ দেওয়ার গল্পটা বল্‌।
তন্ময়: আমার হাতের লেখা বীভৎস বললে সেটা কমিয়ে বলা হবে। স্রেফ আমায় ভালোবেসে পিঠ চাপড়ে দিতে যে গুটিকয় মানুষ বংপেন বইটায় আমায় সই করতে বলেছেন, তাঁদের বিভিন্ন বাহানায় ডাইভার্ট করেছি। বইটা আমার ভীষণ প্রিয়; তাঁর গায়ে হিজিবিজি দাগ দিতে মন চায় না। 

অভিষেক: তুই ইংরেজি-বাংলা দুটোই সমান ভাল লিখিস্‌। ইংরেজিতে লেখার কথা ভেবেছিস্‌?
তন্ময়: আমার কনভার্সেশনল টোনে বা কথোপকথনের ভঙ্গিমায় লিখতে ভালো লাগে। সে কারণেই আমি প্রবন্ধভিত্তিক লেখা না লিখে প্লটভিত্তিক লেখার চেষ্টা করি; বিষয় প্রবন্ধের দাবী রাখলেও। মুশকিল হচ্ছে আমি ভীষণ ভাবে শহুরে বাঙালির কনভার্সেশনল টোনে অভ্যস্ত। সে কারণেই ইংরেজিতে লিখলে ক্রিস্প্‌ লেখায় যে মেজাজ থাকা উচিত সেটা ধরে রাখতে বেশ হিমশিম খাব বলে আমার বিশ্বাস। এমনকি নিজের বাংলা পোস্ট ইংরেজিতে অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি কয়েকবার; আউটপুটকে যথেষ্ট যুতসই মনে হয় নি। 

অভিষেক: দুটো সংস্করণ তো বেরিয়ে গেল। নতুন বই কবে আসছে?
তন্ময়: ব্লগ সংকলন ? প্রথমটির আইডিয়া রোহণের ছিল। নতুন লেখা নিয়ে নতুন ব্লগ সংকলনের বিষয়ে এখনই হাতেগরম কোনও চিন্তা নেই। ইয়ে, ভারি ইচ্ছে। মানে। জেনুইন ইচ্ছে। একটা উপন্যাস লেখার। আহা, যদি পারতাম গো অভিষেক দাদা...

Saturday, March 22, 2014

অবান্তর, পিরামিড, ও একটি সাক্ষাৎকার

অবান্তরের সঙ্গে আমার বেশ অনেকদিনের আলাপ। তা প্রায় বছরচারেক আগে। তখনও অবান্তর এতটা জমজমাট হয়নি, ঐ বাচ্চাদের মতই টলে-টলে হাঁটত। আমার ব্লগ তার আশেপাশেই শুরু হয়েছিল, কিন্তু অবান্তর যেভাবে তর্‌তর্‌ করে হাঁটতে শুরু করল তাতে বেশ হকচকিয়ে গেলাম।

খাঁটি বাংলা ব্লগ বেশ বিরল (যদিও একদম নেই তা নয়)। যারা আছে তাদের মধ্যে অবান্তরের রমরমা বেশ ওপরের দিকেই। কিন্তু এই রিভিউ কুন্তলার ব্লগ নিয়ে নয় — ওর বই নিয়ে। হ্যাঁ, ওর বইয়ের নামও "অবান্তর" (বইয়ের নাম লিখলে বোধহয় উদ্ধৃতিচিহ্ন দিতে হয়)।

অ্যামাজন থেকে ছবি ঝাড়ার মজাই আলাদা!
মিশরীয়রা এককালে পিরামিড-ফিরামিড বানাত না? "অবান্তর" হচ্ছে একদম ঐ জিনিস। একদম খাঁখাঁ মরুভূমি, কোত্থাও ট্রেন নেই, ট্রেন নেই, ট্রাক নেই, কিস্যু না, হঠাৎ করে কয়েকটা আখাম্বা পিরামিড, সামনে গিয়ে দাঁড়ালে মুখ আপনা থেকেই হাঁ হয়ে যাবে, তাও আবার কয়েক সহস্রাব্দ ধরে দাঁড়িয়ে!

কুন্তলার লেখা ঠিক সেইর'ম; কিস্যু নেই, একদম পাতি একটা রোজকার ঘটনা — কেন কেউ তাকে নিয়ে লিখতে যাবে? কিছু ফুল হয় না? এক্কেবারে এলেবেলে, নয়নতারাও নয়, একদম নাম-না-জানা ফুল, তার গন্ধটা খুব বাড়ির কথা মনে করায়? এই মেয়েটা সেইসব নিয়ে লেখে।

ঐ অজানা উটকো ফুল, যাকে নিয়ে লেখার কথা কারুর জীবনেও মাথায় আসবে না (প্রবৃত্তিও হবে না) সেইসব নিয়ে লেখার প্ল্যান করে ফেলল। হঠাৎ করে তর্‌তরিয়ে নদীটদি বইতে লাগল, আর ঐ ফুলের গন্ধটা একটা নামও পেয়ে গেল। আর ঐ যে, মুখ হাঁ হয়ে গেল, আর তারপর লেখাটা মনের ভেতর রয়েই গেল, রয়েই গেল, রয়েই গেল।

কুন্তলার আরেকটা মারকাটারি গুণ হল, ও নিজেকে নিয়ে হাসতে পারে। আর হাসি মানে খ্যাঁকখেঁকিয়ে হাসি না, কীর'ম একটা বাজে নাছোড়বান্দা হাসি যেখানে পড়তে পড়তে আপনার বত্রিশপাটি দাঁতও বেরোবে, আর হঠাৎ করে দেখবেন চোখটা কীর'ম জ্বালাজ্বালাও করছে। সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। ছত্রিশ বছর বয়সে বই পড়তে পড়তে চোখ ছল্‌ছল্ করলে প্রেস্টিজ থাকে, বলুন?

ভাষাটার ভবিষ্যৎ তো বিশেষ সুবিধের মনে হচ্ছে না, এখন এই মেয়েটা যদি একটু ভেন্টিলেটর দেয়, এই আর কী। একটা আইকনের বড্ড দরকার।

বইটা এমনিই একটা দারুণ প্রাপ্তি, কিন্তু সঙ্গে ছিল রোহণ কুদ্দুসের দারুণ ছবি। প্রকাশক নিজে ছবিটবি আঁকতে শুরু করলে একটা মারাত্মক কম্বিনেশন হয়। সাধে "সৃষ্টিসুখ"এর এত জয়জয়কার?

***

অভিযোগ: আমার প্রিয় লেখার মধ্যে অনেকগুলো নেই, বিশেষতঃ "হ্যাদ্দেহোয়া" (এই ফাঁকে চট্‌ করে আবার পড়ে ফেললাম)।

***

বোনাস প্রাপ্তি: কুন্তলার সঙ্গে সাক্ষাৎকার। আমি ওকে অনেকদিন চিনি, তাই তুই-তোকারি করছি। ঋতুপর্ণ হওয়ার চেষ্টা করছি না।

অভিষেক: প্রথম কবে ভেবেছিলি যে বই বেরোবে?
কুন্তলা: বই বেরোবে, লাল রঙের চামড়াবাঁধাই হার্ডকভার, দাম করব নিরানব্বই টাকা নব্বই পয়সা — সেরকম তো কিছু ভাবিনি, ভেবেছিলাম গল্পগাছা লিখব। সেটা প্রথম ভেবেছিলাম ক্লাস থ্রি-তে। লিখব অথচ ছাপা হবে না, এমন ডিপ্রেসিং ওয়ার্ল্ডভিউ তখন ছিল না, কাজেই ধরে নেওয়া যেতে পারে ক্লাস থ্রি-তেই ভেবেছিলাম বই বেরোবে। আনন্দমেলায় একটা গল্প পড়ে লেখক হওয়ার আইডিয়াটা প্রথম মাথায় আসে। মাকে গিয়ে বলতে মা নিশ্চয়’বলে ঘাড় নেড়েছিলেন। মায়ের সম্মতি পেয়ে খুব ফুর্তি হয়েছিল মনে আছে। পরে অবশ্য বুঝেছি মায়ের ঘাড়নাড়ার ওপর ভরসা করা বিপজ্জনক। কারণ ক্লাস ফোরে বলেছিলাম পাইলট হব, তাতেও মা ঘাড় নেড়েছিলেন, ক্লাস ফাইভে দিদিমণি, তাতেও। খালি ক্লাস নাইনে উঠে যখন বললাম বাড়ির ছাদে মাশরুমচাষ করে দেশেবিদেশে রপ্তানি করব, মা একটু সন্দেহপ্রকাশ করেছিলেন। ব্যাপারটা লাভজনক হবে কি না সে বিষয়ে।

অভিষেক: ব্যাপারটা কীভাবে হল একটু গুছিয়ে বল্‌।
কুন্তলা: বই বেরোনোর ব্যাপারটা? সেরকম কিছুই হয়নি। আমি দিব্যি অবান্তর লিখছিলাম। এমন সময় হঠাৎ ই-মেলে রোহণ কুদ্দুস বলে একজনের দু-লাইনের একটা চিঠি এল। আমি "সৃষ্টিসুখ" বলে একটি প্রকাশনা সংস্থা চালাই, আপনার লেখা ছাপতে চাই। যেদিন মেলটা এল, সেদিন আবার আমার বিয়ে। আমি চিঠির উত্তর দিলাম হানিমুনটানিমুন সেরে এসে। রোহণ ভেবেছিল যে আমি ওর চিঠিটাকে ইয়ার্কি মনে করেছি, তাই উত্তর দিইনি। তারপর তো অনেক মেল-টেল চালাচালি হল, লেখা বাছাবাছি হল, প্রুফ দেখাদিখি হল, তারপর বই বেরিয়ে গেল।

অভিষেক: তোর বইয়ে কৃতজ্ঞতা স্বীকার-ফিকারের কোনও গল্প নেই। এখানে সারবি ব্যাপারটা?
কুন্তলা: সেকী, "উৎসর্গ" আছে তো। অবান্তরের পড়ুয়াদের। তাঁরা না পড়লে তো আমার ব্লগ লেখার ধৈর্য থাকত না, বইও বেরোত না। উৎসর্গ আর কৃতজ্ঞতা স্বীকার এক নয় বুঝি? আচ্ছা তাহলে স্বীকার করছি দাঁড়াও।
রোহণ কুদ্দুসের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, আমার বই ছেপে বের করার জন্য।
অর্চিষ্মানের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, লেখার সময় কানের কাছে গোলমাল না করার জন্য।
আর আমি সবথেকে বেশি কৃতজ্ঞ কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। জীবনে অন্তত একটা জিনিস লেগে থেকে করার জন্য।

অভিষেক: আমার প্রিয় লেখাগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই নেই, তার মধ্যে সবথেকে মারাত্মক অমিশন ছিল "হ্যাদ্দেহোয়া"। তুই কীভাবে লেখা বেছেছিলি?
কুন্তলা: এই রে, আমার মায়েরও বইয়ের অনেক লেখা পছন্দ হয়নি। আমি তো আমার পছন্দমতোগুলোই বাছলাম মনে হল। যে লেখাগুলো পড়লে লোকের ভালো লাগতে পারে, সেই রকম লেখা খুঁজে খুঁজে বার করলাম। রোহণও কিছু বেছেছিল। "হ্যাদ্দেহোয়া" যে বাদ পড়ে গেছে, সেটা আমি নিজেই অনেকদিন পর্যন্ত খেয়াল করিনি। যখন খেয়াল হল ততক্ষণে হাতের তীর বেরিয়ে গেছে।

অভিষেক: বান্টি কি বাস্তব চরিত্র (এটা আরও অনেকের প্রশ্ন; আমি এমনও প্রশ্ন পেয়েছি বান্টিই অর্চিস্মান কিনা)?
কুন্তলা: বান্টি আর অর্চিষ্মানকে এক ও অবিকল ভাবলে বান্টিও পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসবে, অর্চিষ্মানও। আকার ও প্রকারে এত ভিন্নরকম দুটো লোক আমি জীবনে আর দেখিনি। বান্টি বাস্তব। রক্তমাংসের বাস্তব। ছেলেটা যেমন ভালো, তেমনি মজার। ওর সঙ্গে কথাবার্তা চলার সময় কেউ যদি আধঘণ্টা না হেসে থাকতে পারে তাহলে সে প্রতিভা। তবে অনেকদিন বান্টির সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।  

অভিষেক: ছবিগুলো কিন্তু মারাত্মক হয়েছে। আইডিয়াটা তোর না রোহণের?
কুন্তলা: ছবির আইডিয়া ও এক্সিকিউশন, দুইই রোহণের। আমাকে আরও অনেকে ছবি ভালোলাগার কথা জানিয়েছেন।

অভিষেক: তুই কি আদৌ বুঝিস্‌ যে তোরা (যারা ভাল লিখিস্‌) যদি লেখাটা আরেকটু সিরিয়সলি নিস্‌, তাহলে মৃতপ্রায় ভাষাটা আবার ঘুরে দাঁড়াবে?
কুন্তলা: আমার ওপর তোমার এমত ভরসা দেখে আমি মুগ্ধ। ধন্যবাদ।
বাংলা ভাষা কি ভালো লেখার অভাবে মৃতপ্রায় হয়েছে? যদি ধরে নিই যে বাংলা মরতে শুরু করেছে গত কুড়ি, তিরিশ, পঞ্চাশ বছরে, তখন তো পুরোদমে লিখছেন সুনীল, শীর্ষেন্দু, লীলা, নবনীতা, মহাশ্বেতা। শংকরের প্রতিটি বই বেস্টসেলার হচ্ছে। সে সব বই থেকে আবার সিনেমাও হচ্ছে। বোদ্ধাদের পিঠচাপড়ানি পাচ্ছে, নির্বোধেরাও দেখছে শনিরবি টিভির সামনে বসে। অন্যান্য ভাষার সঙ্গে তুলনা করেও যদি দেখি, এই দেখ, জ্ঞানপীঠ আমাদের থেকে বেশি পেয়েছে মোটে কন্নড় আর হিন্দি, বাকি সবাইকে আমরা হারিয়েছি। ভালো লিখেছি বলেই না?
যদি ধরে নিই বাংলাভাষা মরতে বসেছে, তবে সেটা সাহিত্যের পাতায় নয়, আমাদের রোজকার জীবনে। আমরা আর বাংলায় কথা বলছি না, ছেলেমেয়েকে বাংলা শিখতে উৎসাহ দিচ্ছি না। টিভিতে বাংলায় স্বাস্থ্যকর পানীয়ের বিজ্ঞাপনে দু'বেলা অম্লানবদনে বসে বসে শুনছি, 'এতে আছে আধ কাপ দুধ যত পুষ্টি, আর এক কাপ বাদাম যত প্রোটিন'। সেসব বিজ্ঞাপনের বাচ্চা মডেলদের গলা কোন বাঙালি বাচ্চারা ডাব করে জানি না, তবে তারা যদি বাড়িতে বাবামায়ের সঙ্গেও ওই উচ্চারণে বাংলায় কথা বলে থাকে তবে তাতে সাহিত্যিকদের ষড়যন্ত্র কিছু আছে বলে তো মনে হয় না। সুনীল আর তেমন ভালো লিখতে পারছিলেন না বলে, বা মিতিনমাসি ব্যোমকেশের মতো জমছিল না বলে আমি আমার সন্তানকে সত্তর বছরের প্রতিষ্ঠিত সরকারি বাংলা স্কুলে না পাঠিয়ে, পাশের পাড়ার আগড়ুম-পয়েন্ট বা বাগড়ুম-সেন্টারে ভর্তি করে এসেছি, তেমন কি কেউ দাবি করছে? আসলে আমাদের কী করে যেন ধারণা হয়েছে যে ইংরিজিতে ইতিহাস ভূগোল জীবনবিজ্ঞান ভৌতবিজ্ঞান না পড়লে গোটা প্রজন্ম না খেয়ে মরবে। আমি আজ পর্যন্ত সে রকম দুর্ঘটনা ঘটতে দেখিনি বা শুনিনি অবশ্য, তবে আমি আর কতটাই বা দেখেছিশুনেছি।
বাংলা ভাষা থেকে একটা জে কে রোলিং বা সলমন রুশদি, নিদেনপক্ষে একটা চেতন ভগত-ও যদি বেরোয়, আমি অন্তত দেখতে পাচ্ছি না সেটা বাংলাভাষাকে বর্তমান পরিস্থিতিকে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। বা হরলিক্সের বিজ্ঞাপনকে।
তবে সত্যি বলছি, আমি চিন্তিত নই। আমার চেনা অনেকেই আমাকে বললেন যে বাংলা শেখা, বাংলাকে ভালোবাসা, বাংলা স্কুলে যাওয়া না যাওয়ার ওপর নির্ভর করে না। পুরোটাই বাড়ির, বাবামায়ের কেরামতি। ইস্কুলে রাইমস পড়ছে পড়ুক না, হোমস্কুলিং বাংলায় হবে। সচেতন হয়ে তাঁরা সন্তানদের ভালো ভালো ক্ল্যাসিক সাহিত্য পড়াবেন। ভাষাটাকে ভালোবাসতে শেখাবেন। রবীন্দ্রনাথ, হুতোম প্যাঁচারও শুনেছি হোমস্কুলিং হয়েছিল। সে কথা মনে রাখলে আজকালকার বাচ্চারা বরং বেটার বাংলা শিখবে। কাজেই বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই, উল্টে উল্লাসেরই অবকাশ আছে।
তাছাড়াও আরেকটা কথা শুনি খুব, ভাষা নাকি নদীর মতো। চণ্ডীদাস বিদ্যাপতির বাংলা যেমন মরে গেছে, তোমারআমার বাংলাটাও মরে যাবে তেমন একদিন। তার জায়গায় অন্য কোনও বাংলা জন্ম নেবে, অন্য কোনও বাংলায় লোকে কথা বলবে, গান গাইবে, ছড়া লিখবে। সেটা আমাদের শুনতে ভালো লাগবে না হয়তো, তবে তাতে কিছু এসে যায় না।

অভিষেক: ফিকশন লেখার প্ল্যান আছে? ছোটগল্প, উপন্যাস, যা হোক্‌?
কুন্তলা: কপোলকল্পনাকে প্ল্যান বলা যায় কি? তাহলে আছে।

অভিষেক: প্রথম অটোগ্রাফ দেওয়ার অভিজ্ঞতাটা বল্‌।
কুন্তলা: এইটা একটা খুব হতাশাজনক ব্যাপার। প্রথম অটোগ্রাফ দিয়ে শিহরণটিহরণ কিছুই হয়নি। নিজের নাম সই করলাম, ব্যাংকের ফর্মের বদলে একটা বইয়ের পাতায়, ব্যস্‌। একটাই টেনশন হচ্ছিল, হাতের লেখাটা খারাপ হল নাকি।  

অভিষেক: "অবান্তর ২" কবে বেরোবে?
কুন্তলা: কে জানে?

Followers