BANNER CREDITS: RITUPARNA CHATTERJEE
A woman with the potential to make it big. It is not that she cannot: she simply will not.
PHOTO CREDITS: ANIESHA BRAHMA
The closest anyone has come to being an adopted daughter.

Thursday, August 22, 2019

রবীন্দ্রনাথ ও ক্রিকেট

অযথা না ফেনিয়ে প্রথমেই আশ্বস্ত করছি, রবীন্দ্রনাথ ক্রিকেট খেলতেন। ১৯৬২ সালের ৩রা জানুয়ারি আনন্দবাজারে জগদীশচন্দ্র রায়ের লেখা চিঠি এর সবথেকে বড় প্রমাণ। চিঠিটার একটা অংশ শঙ্করীপ্রসাদ বসু “সারাদিনের খেলা”য় উদ্ধৃত করেছেন। আমি সেটা হুবহু টাইপ করে দিচ্ছি।

“১৯নং স্টোর রোডে (বালীগঞ্জ) স্বর্গীয় সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় থাকতেন। তিনি তাঁর পেনসনের সমস্ত টাকাটাই দেশের জন্য খরচ করতেন। বিশেষ করে পালোয়ানদের ও লাঠিয়ালদের মাহিনা দিয়ে দক্ষিণ কলকাতার ছোট-ছোট ছেলেদের সংগঠন [sic?] ও শক্তিশালী করতেন। রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকো থেকে সপ্তাহে তিন দিন নিয়মিত এসে খেলায় যোগ দিতেন।

১৯নং স্টোর রোডের সামনেই মিলিটারী মাঠ; সেই মাঠের একপাশে তখনকার দিনের ভারত-বিখ্যাত সাহেবদের ক্রিকেট-ক্লাব। ঐ ক্লাবে ভারতীয়দের সভ্য হবার কোন উপায় ছিল না, তাঁরা যতই বড় হউন না কেন।

কোনো একদিন ঐ ক্লাবের ক্রিকেট-খেলা দেখে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মেজদাদাকে বলেন। সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর ম্যানেজার মিঃ ভোগেল এবং আমাকে ব্যাট, বল, নেট প্রভৃতি কিনতে পাঠিয়েছিলেন। ঐ সঙ্গে বলে দেন – ভারতীয় দোকান থেকে জিনিস কিনতে। আমরা এস্‌প্ল্যানেডের উত্তর দিকের দোকান থেকে সমস্ত জিনিস কিনে ফিরি। তার পরদিন থেকেই খেলা আরম্ভ হয়। সত্যেন্দ্রনাথ দুই জন অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ানকে মাইনে দিয়ে খেলা শিখাবার জন্য নিযুক্ত করলেন। রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকো থেকে প্রত্যহই খেলা দেখতে ও খেলতে আসতেন। রবীন্দ্রনাথের এই খেলা কিন্তু মোটেই ভাল লাগেনি। তার কারণ একদিন খেলতে-খেলতে একটা বল তাঁর পায়ে লাগে এবং তিনি জখম হন। তাছাড়া ক্রিকেট খেলার যা বিশেষ দরকার, তা তাঁর ছিল না। অর্থাৎ তিনি তাঁর মন ও চোখ ঠিক রাখতে পারতেন না। প্রায় তিন মাস পরে ক্রিকেট খেলা ছেড়ে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রিয় খেলা লাঠি নিয়ে থাকতেন। তাঁর দাদা অবশ্য বৃদ্ধ বয়সেও ক্রিকেট খেলতেন।

কাজেই তিনি যে খেলতেন, তা নিয়ে সন্দেহের বিশেষ অবকাশ নেই, তবে এটা ঠিক কবে সে ব্যাপারে সঠিক কিছু জানা যায়নি।

পায়ের চোটটা কতটা সিরিয়স সে ব্যাপারে ইতিহাস মোটামুটি নীরব। আশাকরি আলখাল্লাটা চোট লুকোনোর জন্য পরা শুরু করেননি। 

তবে জগদীশবাবুর লেখা পড়ে মনে হয় যে চোটটা গৌণ কারণ। ক্রিকেট যে কেবলই যাতনাময় হতে পারেনা সেটা উনি নির্ঘাত বুঝেছিলেন। বাহির-পানে চোখ মেলা আর পোষাচ্ছিল না সম্ভবতঃ।

দেখাই যাচ্ছে যে বিশেষ সুবিধে করে উঠতে পারেননি, অবশ্য পারলেও বেশিদূর এগোতে পারতেন না। ক্রিকেটের চর্চা রায়বাড়িতে হত, ঠাকুরবাড়িতে নয়।

যা হয়েছে ভালই হয়েছে। এতটাই এন্টারপ্রাইজিং যে ক্রিকেটটা সিরিয়সলি নিলে নির্ঘাত কিছু একটা করে বসতেন। আইপিএলে হয়ত দলের নাম হত কলকাতা আরএনটিজ। 

ভাগ্যিস খেলেননি। অতগুলো মণিহার একসঙ্গে ম্যানেজ করতে পারতেন না।

আর কিছু না হোক, বর্ষার গানগুলো যে লিখতেন না সেটা জোর দিয়েই বলা যায়।

*

খেলা ছাড়লেও আদৌ খবর রাখতেন কি ক্রিকেটের? পড়তেন? ভাবতেন? আকাশে পাতিয়া কান খোঁজ নিতেন কী হচ্ছে না হচ্ছেন? নাকি নীল পদ্মের মতই নিভৃতে থেকে যেত ক্রিকেট?

ক্রিকেট নিয়ে কয়েকটা লেখা লিখলে পারতেন অবশ্য। ব্র্যাডম্যানকে আদৌ পছন্দ করতেন বলে মনে হয় না, মহাপঞ্চক গোছের কিছু বলে বসতেন হয়ত। বা হয়ত “বোঝা তোর ভারী হলে ডুববে তরীখান” গোছের কিছু গেয়ে উঠতেন।

না না, রবীন্দ্রনাথ লিখলে ট্রাম্পার বা রনজিকে নিয়েই লিখতেন।

দু'টো ঘটনা এখানে বলা আবশ্যক। বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদিগকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য” একবার একটা সভার আয়োজন করেন। সেটা বৈশাখ ১৩১২। অর্থাৎ এপ্রিল বা মে ১৯০৫।

বক্তৃতা দিতে এসে রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় বললেন আজ সাহিত্য-পরিষৎ আমাদিগকে যেখানে আহ্বান করিয়াছেন তাহা কলেজ-ক্লাস হইতে দূরে, তাহা ক্রিকেট-ময়দানেরও সীমান্তরে, সেখানে আমাদের দরিদ্র জননীর সন্ধ্যাবেলাকার মাটির প্রদীপটি জ্বলিতেছে।

সে বললেন বেশ করলেন, এটা তেমন মারাত্মক কিছু নয়। কিন্তু আসল বোমাটা তিনি এই বক্তৃতায় ইতিমধ্যেই ফেলে বসে আছেন, এর ঠিক আগে: দিনের পড়া তো শেষ হইল, তার পরে ক্রিকেট খেলাতেও নাহয় রণজিৎ হইয়া উঠিলাম। তার পরে?

আপাতঃদৃষ্টিতে এটা মারাত্মক কিছু মনে না হলেও একটা চিন্তা মাথায় ঢুকেই গেল। রণজিৎ মানে নেহাৎই যুদ্ধে (ক্রিকেট ম্যাচে) জয়ী? নাকি রণজিৎসিংজি?

আগেই বলেছি, এটা ১৯০৫। তার আগের ছ'বছরে ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটে রীতিমত অগ্নিকাণ্ড ঘটাচ্ছেন রনজি। হোভে ঈস্টবোর্নে হেস্টিংসে শুধু নয়, লর্ডসে ওভালেও ব্যাট হাতে ভৈরব হরষে রান করে চলেছেন। এর মধ্যে চার বছর সাসেক্সের অধিনায়কও ছিলেন তিনি। ১৯০২এ গড় সামান্য নামলেও সে তেমন কিছু নয়।

বক্তৃতার আগের বছর, অর্থাৎ ১৯০৪এ, দশ সপ্তাহের একটা অধ্যায়ে তিনি আটটা সেঞ্চুরি, পাঁচটা পঞ্চাশ করেছিলেন। 

তারপর প্রায় চার বছর ভারতে ছিলেন রনজি। ১৯০৫ সালের মে মাসে (অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতার সময়েই) মনসুর খচর বম্বে হাইকোর্টে রনজির নামে কেস করেন, তবে সে অন্য গল্প। তবে মামলা-মোকদ্দমার ঠেলায় গোটা বছরটাই রঞ্জিকে দেশে কাটাতে হয়।

সন্দেহটা ঘনীভূত হওয়ার আরেকটা কারণ হল যে রবীন্দ্রনাথ রনজির ব্যাপারে বিলক্ষণ জানতেন। চৈত্র ১৩০৮এ (অর্থাৎ মার্চ বা এপ্রিল ১৯০২) একটা প্রবন্ধ (সম্ভবতঃ) লিখেছিলেন, নাম বারোয়ারি-মঙ্গল”। সেখানে লিখেছেন রামমোহন রায় আজ যদি ইংলণ্ডে যাইতেন তবে তাঁহার গৌরব ক্রিকেট-খেলোয়াড় রঞ্জিতসিংহের গৌরবের কাছে খর্ব হইয়া থাকিত।

১৯০০ আর ১৯০১ রনজির স্বর্ণযুগেও একেবারে চব্বিশ ক্যারাট। 

*

কিন্তু এ তো গেল রনজি নিয়ে বক্তৃতা প্রবন্ধ। মেনস্ট্রিমে ক্রিকেট কি একেবারেই নেই? চিরকুমার সভার দ্বিতীয় অঙ্কের দ্বিতীয় দৃশ্যে শ্রীশ দিব্যি বলছে: তোমরা যে দিনরাত্রি ফুটবল টেনিস ক্রিকেট নিয়ে থাক, তোমরা একবার পড়লে ব্যাট্‌বল গুলিডাণ্ডা সবসুদ্ধ ঘাড়-মোড় ভেঙে পড়বে।

ব্যাটবলের প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে “গোরা” থেকে কয়েকটা উদ্ধৃতি দিই:

“এখানকার মেলা উপলক্ষেই কলিকাতার একদল ছাত্রের সহিত এখানকার স্থানীয় ছাত্রদলের ক্রিকেট-যুদ্ধ স্থির হইয়াছে। হাত পাকাইবার জন্য কলিকাতার ছেলেরা আপন দলের মধ্যেই খেলিতেছিল। ক্রিকেটের গোলা লাগিয়া একটি ছেলের পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে।”

সর্বনাশ, আবার পায়ে চোট কেন? আত্মকথা লিখছিলেন নাকি? আর এতদিন বল বল লিখে হঠাৎ ১৯১০এ এসে গোলা কেন?

পরে আবার ছাত্ররা গোরাকে চিনিত – গোরা তাহাদিগকে লইয়া অনেকদিন ক্রিকেট খেলাইয়াছে।

এসবের বেশ কিছু পাতা আগে “ধাপার মাঠে শিকারির দলে নন্দর মতো অব্যর্থ বন্দুকের লক্ষ কাহারো ছিল না। ক্রিকেট খেলায় গোলা ছুঁড়িতেও সে অদ্বিতীয় ছিল। গোরা তাহার শিকার ও ক্রিকেটের দলে ভদ্র ছাত্রদের সঙ্গে এই-সকল ছুতার-কামারের ছেলেদের একসঙ্গে মিলাইয়া লইয়াছিল।

*

ইংরাজি সহজশিক্ষার Chapter 38এ for শেখাতে গিয়ে the potter makes a cup for his father” জাতীয় কয়েকটা একই ধরনের বাক্য ব্যবহার করেছেন। এরই একটা হল the boy takes his bat for a game.

মজার ব্যাপার, এই ব্যাটবাহক বালক ছাড়া চ্যাপ্টারে বাকি সবাই হয় কাজ বা পড়াশুনো করছে। এরই শুধু অখণ্ড অবসর।

*

এই অদ্ভুত বিষয়ে লেখা শুরু করার কারণটা আগে বলি। আমি রবীন্দ্রনাথের কয়েকটা অখ্যাত লেখা  পড়ছিলাম। অখ্যাত মানে আমার কাছে অচেনা, আমি নিশ্চিত যে অনেকেই বলে দেবে কোন্‌ লেখাটা কী খেয়ে কোথায় বসে কোন্‌ কলমে লেখা। তখনই নারীপ্রগতি কবিতাটা পড়তে পড়তে হকচকিয়ে যাই, বিশেষ করে এই লাইনগুলো:

তোমাদের গজগামিনীর দিনে
কবিকল্পনা নেয় নি তো চিনে;
কেনে নি ইস্‌টিশনের টিকেট;
হৃদয়ক্ষেত্রে খেলে নি ক্রিকেট;
চণ্ড বেগের ডাণ্ডাগোলায় –
তারা তো মন্দ-মধুর দোলায়
শান্ত মিলন-বিরহ-বন্ধে
বেঁধেছিল মন শিথিল ছন্দে।

চণ্ড বেগের ডাণ্ডাগোলা” মনে হয় না আর কেউ কখনও ব্যবহার করেছেন।

*

ব্যাটবলের ব্যাপারে বলব বলেছিলাম। সহজ পাঠের দ্বিতীয় ভাগের দ্বিতীয় ভাগে যেখানে য্‌-ফলা শেখানো হচ্ছে, সেখানে আছে অগত্যা বাইরে ব’সে আছি। দেখছি, ছেলেরা খুশী হয়ে নৃত্য করছে। কেউ বা ব্যাটবল খেলছে। নিত্যশরণ ওদের ক্যাপ‍্‌টেন।

এই ব্যাটবল কি ক্রিকেট? ক্যাপ্‌টেন আছে যখন, ক্রিকেট হতেই পারে (জানি, অত্যন্ত বাজে যুক্তি), কিন্তু একটা খটকা থেকেই যায়। “ছেলেবেলা”য় স্পষ্ট লেখা আছে: তখন খেলা ছিল সামান্য কয়েক রকমের। ছিল মার্বেল, ছিল যাকে বলে ব্যাটবল – ক্রিকেটের অত্যন্ত দূর কুটুম্ব। আর ছিল লাঠিম-ঘোরানো, ঘুড়ি-ওড়ানো। শহরে ছেলেদের খেলা সবই ছিল এমনি কম্‌জোরি। মাঠজোড়া ফুটবল-খেলার লম্ফঝম্ফ তখনো ছিল সমুদ্রপারে।

এটা খুব অস্বস্তিকর। মাঠের অভাবে ফুটবল হত না, তাই ক্রিকেট হওয়ার প্রশ্নই উঠছে না। ডাংগুলিও নয়, কারণ আমরা আগেই শ্রীশকে ব্যাটবল আর গুলিডাণ্ডা আলাদাভাবে বলতে দেখেছি। কাজেই ডাংগুলির ডাণ্ডা আর গুলিকে আদৌ ব্যাট-বল বলা হত না।

ব্যাটবলের কথা “যোগাযোগ”এও ছিল: “বিপ্রদাস বাল্যকালে যে ইস্কুলে পড়ত সেই ইস্কুলেরই সংলগ্ন একটা ঘরে বৈকুণ্ঠ ইস্কুলের বই খাতা কলম ছুরি ব্যাটবল লাঠিম আর তারই সঙ্গে মোড়কে-করা চীনাবাদাম বিক্রি করত।”

ব্যাট আর বল এত সহজলভ্য ছিল তখন যে বাদামের সঙ্গে একই দোকানে পাওয়া যেত? নাকি এই ব্যাটবল ক্রিকেটের ব্যাট আর বল নয়, সেই রহস্যময় ব্যাটবল” খেলার ব্যাট আর বল?

হয়ত। হয়ত নয়। অত না জানলেও চলবে। ক্রিকেট খেলতেন, জানতেন, বুঝতেন, এতেই আমি ধন্য। দু'-একটা খটকা থাক। মাঝে মাঝে তার ছিঁড়তেই পারে, তাতে অত হাহাকার করার কিছু নেই।

*

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
tagoreweb.in
শঙ্করীবাবুর বইয়ে ঐ চিঠিটা

*

পুনশ্চ:
সুমিত গঙ্গোপাধ্যায় যথারীতি এই একই বিষয়ে কাজকর্ম করে রেখেছেন। এখানে ওর লেখার লিঙ্ক রইল। দু'টো লেখার নাম এক হওয়াটা নেহাৎই সমাপতন।

Followers