BANNER CREDITS: RITUPARNA CHATTERJEE
A woman with the potential to make it big. It is not that she cannot: she simply will not.
PHOTO CREDITS: ANIESHA BRAHMA
The closest anyone has come to being an adopted daughter.

Sunday, September 18, 2011

চোট

(এটা আনন্দবাজারের একটা প্রতিযোগিতার জন্য লেখা। প্রতিযোগিতার নিয়মাবলী এখানে পাওয়া যাবে। আমি নিশ্চিত যে এই অদ্ভুত লেখা আদৌ ছাপা হবে না, তাই নির্দ্বিধায় এখানে লিখে ফেললাম।)
__________________________________________________________


ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল ঋষি। মেয়েটা একেবারে সামনে। ক্রসিং-এর লাল লাইটে গান বাজছে "যদি তারে নাই চিনি গো..."

ঋষির দোষ নয়। সিগনাল পড়ে গেছে, মেয়েটা অনায়াসে একদম মোড় দিয়ে রাস্তা পেরোতে পারত। কিন্তু সবাই যদি তাইই করত, তাহলে ট্র্যাফিকের অবস্থা আজ এত শোচনীয় হত না। আসলে রাস্তা যে গাড়ির নিজস্ব অঞ্চল, তা বেশিরভাগ পথচারীরই নিরেট মাথায় ঢোকে না।

লোক জড় হয়ে গেল নিমেষের মধ্যে। ঋষি কিছুতেই বোঝে না, একটা সামান্য দুর্ঘটনা হলেই এত লোক এসে জোটে কীভাবে? অথচ খবরের কাগজে প্রায়ই বেরোয়, সত্যিকারের বড় কিছু হলে মৃতদেহ পড়ে থাকে, লোকে  পাশ কাটিয়ে চলে যায়। আর এইর'ম ফালতু কেসে?

ঋষি নামল গাড়ি থেকে। বেশি দেরি হলে হয়ত এরাই আগুন-ফাগুন জ্বালিয়ে দেবে। নতুন গাড়ি, তার থেকে নেমে দেখাই ভাল!

মেয়েটার ধাক্কা লাগেনি, তবে মুখ দেখে মনে হয় বেশ ভয় পেয়েছে। "বড়লোকের ছেলের হাতে স্টিয়ারিং" গোছের মন্তব্য ভেসে এল দুয়েকটা।

"আপনি উঠতে পারবেন?"

মেয়েটা মাথা নাড়াল, তারপর নিজেই উঠে দাঁড়াল। সাধারণ, সাদাসিধে, নেহাৎই ঘরোয়া ধরনের দেখতে। পরনে একটা সাদামাটা সালোয়ার-কামিজ। একটা আলগা শ্রী আছে।

"আপনাকে কোথাও পৌঁছে দেব?"

"না না, আমি যেতে পারব। আসলে ট্যাক্সি ধরতেই যাচ্ছিলাম। তারপর..."

ঋষির এবার একটু অপরাধবোধই হল। "দেখুন, আমি ল্যান্সডাউনের দিকে যাচ্ছি, আপনাকে নামিয়ে দেব কোথাও?"

মেয়েটা বেশ লাজুক। অথবা বোধহয় পুরো ব্যাপারটায় একটু ঘাবড়েছে। ইতস্ততঃ করতে লাগল তাইই হয়ত।

"চলুন। আমার কোনো অসুবিধে হবে না।"

"আমি যোধপুর পার্কে থাকি। আপনাকে পুরোটা যেতে হবে না, আপনি ল্যান্সডাউনে নামিয়ে দেবেন, আমি ওখান থেকে চলে যেতে পারব।"

ঋষি হেসে ফেলল। ভিড় পাতলা হতে শুরু করেছে এদিকে।

"বেশ, তাইই হবে। উঠুন এবার।"

***

শ্যামবাজার থেকে ল্যান্সডাউন অনেকটা রাস্তা। তার ওপর মিছিল-টিছিল আছে বোধহয় আজ, একটু বেশিই দেরি হচ্ছিল।

অন্যান্য দিন হলে ঋষি বিরক্তই হত। কিন্তু আজ শর্মিষ্ঠা থাকায় ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে গেছে। মেয়েটা ডাক্তারির ছাত্র, ফাইনাল ইয়ার, খুব ইচ্ছে সার্জেন হবার। খুব ভালো হাত নাকি, প্রোফেসররা বলেন। এইবছর পাশ করবে।

ঋষি এমনিতে বেশ শান্ত, সংযত। মেয়েরা ছোটখাট জামাকাপড় পরলে তাকায়, রাতের দিকে গোলমেলে ওয়েবসাইটে ঘোরাফেরা করে, কিন্তু সেটা পঁচিশ বছরের ছেলেদের পক্ষে স্বাভাবিক ব্যাপার। সেই অর্থে কোনো অ্যাফেয়র হয়নি, আর স্কুলে দুয়েকটা টুকটাক বাদ দিলে কোনো মেয়ের প্রতি সেইর'ম শারীরিক আকর্ষণও বোধ করেনি। বরং সে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ চুটিয়ে আড্ডা দিতে।

শর্মিষ্ঠা মেয়েটা অন্যরকম। আপাতঃদৃষ্টিতে বেশ সাধাসিধে মনে হয়, কিন্তু খানিকক্ষণ কথা বলার পর বোঝা যায়, ওর গলার স্বরে, হাসিতে, তাকানোয় এমন কিছু আছে, যা শুধু আকর্ষণ করে তাইই নয়, মন অশ্লীল করে তোলে। অকারণে ছুঁতে ইচ্ছে করছে বারবার, এইটুকু আলাপেই।

***

একা থাকে ঋষি। বাবা-মা দুর্গাপুরে, সে চাকরি পাওয়ার পর থেকে একের পর এক সম্বন্ধ দেখেই চলেছেন তাঁরা। ঋষিও বদ্ধপরিকর, জানিয়ে দিয়েছে সে আপাততঃ বিয়েতে ইন্টারেস্টেড নয়।

কিন্তু শর্মিষ্ঠা? শর্মিষ্ঠা যদি রাজি হয়, তাহলেও কি সে বিয়ে করবে না? ও সাবধানে তাকাল একবার। গাড়ি জ্যামে আটকে। শর্মিষ্ঠা তাকিয়ে, সামনের দিকে।

চিবুক থেকে ওড়না। অদ্ভুত একটা সর্পিল কার্ভ, গলার; শিউরে উঠল ঋষি। মেয়েটার কালো রঙের মধ্যে একটা আদিম, বন্য আকর্ষণ আছে। বিয়ে হলে এই গলায় ঠোঁট ডুবিয়ে...

সব মেয়ের গলা কী এইর'মই হয়?

গলা শুকিয়ে গেছে ঋষির। জলের বোতলটাও খালি।

"আপনার কাছে জল আছে?"

"হ্যাঁ।"

খেতে গিয়ে ঋষি ফেলল। জামা ভিজল খানিকটা। কিন্তু তার সঙ্গে যোগ হল শর্মিষ্ঠার হাসি। সহজ, সরল হাসি, কিন্তু কিছু একটা আছে যাতে ঋষির শিরায় ধমনীতে আগুন ধরে গেল। সে অনুভব করল, কান, ঘাড় বেশ গরম হয়ে গেছে...

***

ল্যান্সডাউন এল।

"আপনাকে পৌঁছে দিই?"

চুপ।

ঋষিও চুপ।

গাড়িতে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা।

"আপনি আসবেন একটু, আমার বাড়ি?"

শর্মিষ্ঠা চোখ তুলে তাকাল। চোখে আগুন। রাগ? ঋষি জানেনা। জানতে চায়ওনা।

"আপনি একা থাকেন বলেছিলেন না?"

"আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন না?"

শর্মিষ্ঠা সামনের দিকে তাকাল। তারপর আবার ঋষির দিকে। "আমি বাড়িতে একটা ফোন করি, দাঁড়ান। বেশিক্ষণ বসব না কিন্তু।"

ঋষি হাসতে চাইলেও তার শরীর তাকে হাসতে দিল না। ফিজিওলজিতে হয়ত এর প্রকৃত কারণ লেখা আছে কোথাও। ঋষি জানেনা।

ঋষি আর কিছুই জানেনা। গাড়ি থেকে নেমে চশমার কাঁচ মুছে চোখে পড়ল, শর্মিষ্ঠার সাদা কামিজে ঘামের বৃত্ত।

কখন দরজা খুলল, কখন আলো জ্বালল, শর্মিষ্ঠা কখন বাথরুমে গেল, কখন খাবার বের করল, ঋষির কিচ্ছু মনে নেই। শুধু গলা। হাসি। ঘামের ভিজে দাগ।

ঋষি কীর'ম নেশাগ্রস্ত। আলমারি খুলে স্কচ বের করল। শর্মিষ্ঠা বলল ও খায় না। এক পেগ। দুই। তিন। চার।

যুদ্ধ। শালীনতা আর শরীরের।

আরেক পেগ।

অদ্ভুত উন্মাদনা। উন্মত্ততা। সৃষ্টির শুরু থেকেই কী পুরুষ নারীকে এইভাবে চেয়ে এসেছে?

"আমাকে এবার যেতে হবে।"

ঋষি উঠে দাঁড়াল। জ্বরের বিকারগ্রস্ত রোগীর মত কিছু একটা বলতে চেষ্টা করল, পারল না। টলে গেল। শর্মিষ্ঠা কোনোমতে ধরল ঋষিকে, বেডরুমে বিছানা অবধি নিয়ে গেল। ঋষির অধৈর্য, অতৃপ্ত আঙুল, ঠোঁট খুঁজতে চেষ্টা করল শর্মিষ্ঠাকে। আচ্ছন্ন মস্তিষ্ক জানান দিল, একটা একটা করে জামার বোতাম খুলে যাচ্ছে।

শরীর। শরীর।

তারপর আর কিছু মনে নেই।

***

কয়েক মাইল দূরে সেলফোনের ক্ষীণ আওয়াজ। কেটে গেল।

আবার।

আবার।

এবার যেন জোরে।

চোখের পাতা বড্ড ভারি।

ভীষণ শীত।

শরীর অবশ।

শর্মিষ্ঠা...

আবার ফোন।

আবার।

ধরার শক্তি নেই।

***

"ফোন ধরছে না?"

"নাঃ। তুই কর্‌ তো কয়েকবার।"

"আরে, আমি এসব বলতে-টলতে পারিনা।"

"ধুর, এ আবার পারার কি আছে? প্রথমে বলবি, প্যানিক না করতে, কারণ বাথটবে শোয়ানো আছে, আর যে পরিমাণে বরফ দেওয়া আছে, কয়েকঘন্টা সেফ। এমার্জেন্সি নম্বরগুলো দিবি, বেলভিউ উডল্যান্ডস সব, আর বলতে বলবি, দুটো কিডনিই বের করে নেওয়া হয়েছে, যেন এখনই অ্যাম্বুলেন্স পাঠায়। তুই ট্রাই করতে থাক, আমি বাথরুম থেকে আসি একটু।"

Followers