BANNER CREDITS: RITUPARNA CHATTERJEE
A woman with the potential to make it big. It is not that she cannot: she simply will not.
PHOTO CREDITS: ANIESHA BRAHMA
The closest anyone has come to being an adopted daughter.
Showing posts with label Fiction. Show all posts
Showing posts with label Fiction. Show all posts

Monday, August 26, 2019

আকাশে পাতিয়া কান

মূল গল্প: Reunion
লেখক: Arthur C Clarke
অনুবাদ নয়, “ছায়া অবলম্বনে”

----

ভয় পাইও না। তোমাদের সহিত যুদ্ধ করিবার কোনওরূপ প্রবৃত্তি নাই আমাদের। আর প্রবৃত্তি থাকিলেও তোমরা আঁটিয়া উঠিতে পারিতে না, ধূলিকণায় পরিণত হইতে। তোমাদের অস্ত্রভাণ্ডার এতই অপর্যাপ্ত যে শিশুকুলেও তাহা হাসির উদ্রেক ঘটাইবে। কাজেই যুদ্ধ করি বা না করি, ভয় পাইয়া তোমাদের বিন্দুমাত্র লাভ হইবে না। আমাদের এই আগমনের কারণ সম্পূর্ণ পৃথক।

আমাদের কথা যে তোমাদের স্মরণে নাই, সে বিষয়ে আমরা অবগত আছি। তবে অযথা মাথা ঘামাইও না। আর কয় প্রহর পর উপস্থিত হইয়া তোমাদের যাবতীয় কৌতূহলের উপশম ঘটাইব।

তোমাদের পীতবর্ণের সূর্য ইতিমধ্যেই দেখিতে পাইতেছি। এ সূর্য আমাদের পরিচিত। এ সৌরজগৎ একদিন আমাদেরও ছিল। কোটি কোটি বৎসর পূর্বে এই সূর্যের উপাসনা আমরাও করিতাম।

আমরাও তোমাদের মতই মনুষ্যজাতি। পার্থক্য ইহাই, যে তোমরা আত্মবিস্মৃত। আমরা নই। প্রকৃতির রহস্যভেদ আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য হইলেও অতীতের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আজও অটুট।

আমরা প্রথম আসিয়াছিলাম বহুপূর্বে। মুহুর্মুহু উল্কাপাতে আমাদের গ্রহ তখন বসবাসের অযোগ্য হইয়া উঠিয়াছে। প্রতিবেশী পৃথিবীতে তখন অতিকায় সরীসৃপকুলের রাজত্ব সদ্য সম্পন্ন হইয়াছে। কয়েক দশক পর সৌরজগতের বন্ধন ছিন্ন করিয়া নূতন উপনিবেশের সন্ধানে বহুদূরে পাড়ি দিয়াছিলাম। জ্ঞানের স্পৃহা অনতিক্রম্য।

শুনিয়াছি তাহার পর তোমাদের সভ্যতার সূচনা ঘটে। বানরজাতীয় একশ্রেণীর প্রাণী হইতে তোমাদের উদ্ভবের কাহিনী সম্পর্কে তোমরা অবগত আছ। আমাদের পূর্বপুরুষও বানর।

কয়েক সহস্র বৎসর পূর্বে পুনরায় আসিয়াছিলাম আমরা, তোমাদের সভ্যতা স্বচক্ষে দেখিতে। এখন যেখানে ভারতবর্ষ, সেই স্থলাংশের বিভিন্ন প্রান্তে আমাদের গ্রহের অভিযাত্রীদল ছদ্মবেশে কয়েক বৎসর অতিবাহিত করে।

দুরারোগ্য এক ব্যাধিতে তখন ভারতবর্ষ আক্রান্ত। এই ব্যাধি মূলতঃ মানসিক। সুখের বিষয়, তোমাদের কেহ কেহ বিনা প্রচেষ্টায় এই রোগের প্রকোপ হইতে মুক্তি পাইয়াছিল। কিন্তু যাহারা আক্রান্ত হইয়াছিল তাহাদের মুক্তি ছিল না; তাহাদের বংশপরম্পরায় পরিবারের প্রত্যেকে ইহা ভোগ করিত। ইহার নানাবিধ উপসর্গের ফলে মানুষ হিংস্র বর্বর পশুতে পরিণত হইত।

বিপক্ষও বা কতদিন ইহা সহ্য করিয়া থাকিবে? দুই দলের মধ্যে স্বভাবতঃই অশান্তির সূচনা ঘটিয়াছিল। পারস্পরিক ঘৃণা, ঈর্ষা, দ্বেষের ফলে দু’পক্ষের কেহ কাহাকেও সহ্য করিতে পারিত না।

ভারতবর্ষে যুদ্ধের করাল রাত্রি অনিবার্যভাবে ঘনাইয়া আসিতেছিল।

সেই শেষ। তাহার পর পৃথিবীর কথা ভুলিতেই বসিয়াছিলাম প্রায়। বহু গ্রহে-উপগ্রহে-নক্ষত্রে ঘুরিলেও তোমাদের সৌরজগতের সন্নিকটে আর আসি নাই।

তারপর একদিন তোমাদের বেতারবার্তা পাই। তোমাদের ভাষা নিতান্তই সরল, তাই বুঝিতে অসুবিধা হয় নাই। পৃথিবীর উদ্দেশ্যে আরেকবার পাড়ি দিবার সিদ্ধান্তে উপনীত হইলাম।

আমাদের সভ্যতার উন্নতির পরিমাপ তোমাদের ক্ষুদ্র, অনুন্নত মস্তিষ্কের সাধ্যের বাহিরে। তোমরা যদি চাও, পৃথিবীর দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, জলকষ্ট, পরিবেশদূষণ, যুদ্ধবিগ্রহ ইত্যাদি যাবতীয় সমস্যার সমাধান আমরা করিয়া দিব।

পরিশেষে ভারতীয়দের উদ্দেশ্যে বলি, তোমাদের ব্যাধির কথা জানিতেও আমরা উৎসুক। এত যুগ অতিবাহিত হইয়াছে, ইতিমধ্যে হয়ত তাহা ভারতবর্ষ হইতে সমূলে উৎপাটিত হইয়াছে।

আর যদিও প্রশমিত নাও হইয়া থাকে, রোগ যদি মহামারীর আকারও ধারণ করিয়া থাকে, চিন্তিত হইও না। ব্রাহ্মণত্ব নিরাময়ের ক্ষমতা এখন আমাদের নখদর্পণে।

ছবিটা পেয়েছি নাফিসা সুলতানার থেকে; উনি কোত্থেকে পেয়েছেন জানা নেই

Wednesday, August 21, 2019

যোগ্যতা

মূল গল্প: Test
লেখক: Theodore Thomas
অনুবাদ নয়, “ছায়া অবলম্বনে”

----

বড়রা বলেন যে বছর তিরিশ আগে ড্রাইভিং টেস্টটা নাকি ম্যাডক্স স্কোয়্যার ঘিরে হত। অত বাড়ি, যাতায়াতের রাস্তা, সবকিছুর মাঝখানে রাস্তা আটকে সার সার করে নাকি গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকত টেস্টের সময়।

ইউটিউবে না দেখলে রিনি হয়ত বিশ্বাসই করত না কোনওদিন। চারপাশের লোকজনের অসুবিধে যদি বাদও দেওয়া যায়, ঐটুকু জায়গায় কে ভাল গাড়ি চালাতে পারবে আর কে পারবে না সেটা কীভাবে বোঝা সম্ভব?

আজকাল ব্যাপারটা অনেক ভদ্রসভ্য হয়ে গেছে। রাজারহাট ছাড়িয়ে আরও খানিকটা গেলে ওদের আলাদা ক্যাম্পাস, সেখানে ট্রেনিং সেন্টার গেস্টহাউস হাসপাতাল ক্যাফেটেরিয়া সবকিছু আছে। এক মাস থেকে সারাদিন রীতিমত থিয়োরি প্র্যাক্টিকাল ক্লাস করে তবে পরীক্ষা দিতে হয়।

রীতিমত পাকা হাত না হলে পাশ করা সহজ নয় আজকাল। পাশের হার নাকি খুব কম। সাইটে ঠিক হিসেব দেওয়া না থাকলেও দু’তিনটে সোর্স রিসার্চ করে জানিয়েছে যে মাত্র এক শতাংশ পাশ করে।

এক শতাংশটা রিনির মতে অসম্ভব। ফেসবুকে তার বন্ধুদের মতও তাই। তবে এক শতাংশ না হলেও হার যে বেশ কম, সেটা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

তবে এর ভাল দিকও আছে। কলকাতার রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্ট ব্যাপারটা আর হয়না বললেই চলে।

রোজই সাত-আটজনের পরীক্ষা থাকে। আজ রিনির। প্রথমে ক্যাম্পাসের ভেতরে আর বাইরে গাড়ি চালাতে হবে। সঙ্গে থাকবে ট্র্যাকার। বাকিটা ইন্সটিটিউটের ভেতর।

পাশ করলে কাল থেকে কলকাতার রাস্তায় গাড়ি নিয়ে নামবে।

আজ পাঁচ বছর হল সোসাইটির ভেতরে গাড়ি চালাচ্ছে রিনি। ব্যাপারটা বেআইনি হলেও কেউ কিছু বলেনা। সোসাইটিতে আজ অবধি দুর্ঘটনা ঘটেনি, কাজেই কেউ অত ভাবে-টাবে না।

তাই এসব পরীক্ষা রিনির কাছে নেহাৎই ফর্ম্যালিটি। একের পর এক মক টেস্ট দিয়ে ওর সব মুখস্থ। স্বাভাবিকভাবেই কোথাও আটকাল না। ক্যাম্পাসের বাইরে ফাঁকা রাস্তায় চালিয়ে ফেরার পথেই ঘটল ব্যাপারটা।

ব্রেক যে করেছিল সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহই নেই রিনির। গাড়িটাও টিপটপ অবস্থায় ছিল, কাজেই বাচ্চাটার চাপা পড়ার কোনও কারণই ছিল না।

কিন্তু অ্যাক্সিডেন্টটা হল। আর তারপরই ডিভাইডারে ধাক্কা খেল গাড়িটা। তারপর আর কিছু মনে নেই রিনির।

*

ঘুমটা ভাঙল হাসপাতালের বেডে। বেশ বড় কেবিন। খানিকক্ষণ এদিক-ওদিক হাতড়ে কলিংবেল টিপল রিনি।

যিনি ঢুকলেন তাঁর বয়স বছর চল্লিশ হবে, জামায় ইন্সটিটিউটের লোগো। নামের ট্যাগটাও দেখল রিনি: অস্মিতা।

“কনগ্র্যাচুলেশনস রিনি। আপনি পাশ।”

এটা নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশই ছিল না অবশ্য। কিন্তু তার আগে পুরো ব্যাপারটা বোঝা দরকার।

“আমার কী হয়েছিল?”

“চোট লাগেনি। ঐ, নার্ভের জন্য একটা হালকা সেডেটিভ দেওয়া ছিল। এমনিতে আপনি পুরোপুরি ফিট।”

“কিন্তু অ্যাক্সিডেন্ট...?”

“আপনি কী করছিলেন আমরা ইন্সটিটিউট থেকে লাইভ ট্র্যাক করছিলাম তো। অ্যাক্সিডেন্টটা যে আপনার দোষে হয়নি সেটা আমরা জানি।”

ভাল সিস্টেম বলতে হবে।

“আর বাচ্চাটা?”

“কোন্‌ বাচ্চা? ওঃ, যাকে চাপা দিলেন? না, সে বাঁচেনি।”

একমুহূর্তের জন্য রিনির মনটা খারাপ হয়ে গেলেও সেটা পরের কথাতেই ঠিক হয়ে গেল গেল।

“নিন, সই করুন। তবে হ্যাঁ, পড়ে সই করবেন।”

“না না, পড়ার দরকার নেই। এটা আমার অ্যাক্সেপ্টেন্স তো? যে আমি কাল থেকেই গাড়ি চালাব?”

“হ্যাঁ। আপনি যদি এক মাসের বেশি দেরি করেন আপনাকে কিন্তু পরীক্ষাটা আবার দিতে হবে।”

“না না, তার প্রশ্নই উঠছে না। গাড়ি রেডিই আছে। আজ চালাতে পারব না, না?”

হাসলেন অস্মিতা। “একটা দিন সবুর করুন না। এই যে, এখানটায়।”

*

ফর্মটা হাতে নিয়ে গম্ভীর মুখে অস্মিতা বললেন, “আমরা আলোচনা করছিলাম যে এটাই আপনার রিঅ্যাকশন হবে।”

কিছু বুঝতে না পারলেও রিনির মাথায় এটুকু ঢুকল যে কোথাও একটা গণ্ডগোল হচ্ছে পুরো ব্যাপারটায়।

“বাচ্চাটা সত্যিকারের নয়, জানেন রিনি। শুধু ক্যান্ডিডেট দেখতে পায়, অনেকটা হলোগ্রামের মত। এটা কেন করি বলুন তো?”

“রিফ্লেক্স পরীক্ষা করার জন্য?”

আবার হাসলেন অস্মিতা। “সেটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক, না? নাঃ, আমরা তো ক্যান্ডিডেটকে ভাবতে বাধ্য করছি যে ব্রেক কাজ করছে না, তাই না? তাহলে তো রিফ্লেক্সের প্রশ্ন আসছে না।

“আসলে আমরা দেখি একটা বাচ্চাকে চাপা দেওয়ার পরের দিন কেউ পারে কিনা গাড়ি চালানোর মত মানসিক অবস্থায় থাকতে পারে কিনা।”

“সেটা তো আমি পারলাম।”

“ঠিক। আর সেইজন্যই আপনি এখন লাইসেন্স পাবেননা রিনি। কলকাতার রাস্তায় আপনাকে গাড়ি চালাতে দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। যতদিন না এই বোধটুকু দেখা দিচ্ছে ততদিন পরীক্ষা দিতে থাকুন। তবে সেটা সাইকায়্যাট্রিক টেস্ট।”

“এটা কীধরনের ইয়ার্কি?”

কয়েক মিনিটের মধ্যেই সিকিওরিটিকে ডাকতে হল। তবে তারাও এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

*

ওটা এক শতাংশই ছিল। এখন আরও কম। ক্রমশঃ কমছে।

Sunday, August 18, 2019

কর্মণ্যেবাধিকারস্তে

মূল গল্প: Action Will be Taken
লেখক: Heinrich Boll
অনুবাদ নয়, “ছায়া অবলম্বনে”

----

ইন্ট্রোফার্ম এন্টারপ্রাইজের ঐ তিনটে বছর ছিল আমার জীবনে সবথেকে ঘটনাবহুল। আসলে ওদের ব্যাপারটাই আলাদা।

এই যেমন ইন্টারভিউ।

ইন্টারভিউয়ের জন্য আমাকে ডাকা হয়েছিল সকাল সাতটায়। কোনওমতে ঘুমচোখে এসে দেখি ব্রেকফাস্টের এলাহি আয়োজন। দুধ কর্নফ্লেক্স থেকে টোস্ট ডিম বেকন থেকে লুচি আলুর দম থেকে ইডলি দোসা সবকিছু।

খট্‌কাটা তখনই লেগেছিল। যা বোঝার তখনই বুঝেছিলাম। লোভ সংবরণ করে শুধু চা-বিস্কুট খেয়েছিলাম সেদিন সকালে।

ইন্টারভিউয়ের কয়েকটা প্রশ্নের উদাহরণ দিই:

ইন্ট্রোফার্ম: এই যে আমাদের দু’টো করে হাত পা চোখ কান, আপনার কি মনে হয় যে এটা পর্যাপ্ত?
আমি: প্রশ্নই উঠছে না। আমার তো মনে হয়, চারটে করে থাকলেও যথেষ্ট হত না। মানুষের পুরো স্ট্রাকচারটাই ভুল।

ইন্ট্রোফার্ম: আপনি একসঙ্গে ক’টা টেলিফোন সামলাতে পারেন?
আমি: সাতটা হলে বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আটটাতেও একটু অস্বস্তি হয়। আমার ধারণা ন’টা হলে ঠিক হয়।

ইন্ট্রোফার্ম: আপনি অবসর সময়ে কী করেন?
আমি: পনেরো বছরের জন্মদিনে আমি অভিধান খুলে “অবসর” শব্দটা কেটে উড়িয়ে দিয়েছিলাম।

বলাই বাহুল্য, চাকরিটা জুটে গেছিল।

আর পাঁচটা জায়গার থেকে ইন্ট্রোফার্মের ব্যাপারটাই ছিল আলাদা। আমার বস্‌ সুনীল রায় ছিলেন স্ট্যানফোর্ডের এমবিএ। হাবেভাবে কথায়বার্তায় বোঝা যেত তাঁর জ্ঞানের পরিধি, তাঁর দক্ষতা। অনেক কিছু শিখেছিলাম।

তাঁর মত এভাবে হাসতে হাসতে মানুষকে বরখাস্ত করতে আর কাউকে দেখিনি। একশো স্লাইডের পিপিটি বানাতেন পারতেন আধঘণ্টায়। “প্যারাডাইম চেঞ্জ” বা “প্লীজ ডু দ্য নীডফুল” বা “সার্কল অফ ডেথ” ছাড়া কথাই বলতেন না।

আরেকটা কথা খুব বলতেন সুনীলবাবু: অ্যাকশন। আমার জীবনের বীজমন্ত্র হয়ে গেছিল এই অ্যাকশন। সকাল বিকেল রাত এই একটাই শব্দ জপ করতাম। সোম মঙ্গল বুধ বেস্পতি শুক্র শনি রবি। ছুটি তো এমনিতেই বুঝতাম না, তা সে উইকএন্ড হোক বা ১৫ই অগাস্ট বা বড়দিন বা দুর্গাপুজো বা দোল।

শুধু অ্যাকশন, অ্যাকশন, অ্যাকশন। ওই যাকে বলে টোয়েন্টিফোর-সেভেন।

একেবারে বিশ্রাম নিতাম না তা নয়। আঠেরো ঘণ্টা অফিসে থাকতাম, টানা কাজ করলে তো শরীর ভেঙে পড়বে। আর ডেস্কে বসে লাঞ্চ করাও বারণ ছিল। ব্রেক অবশ্যই নিতাম, ক্যান্টিনে খেতে খেতে, দশটা থেকে সোয়া দশটা, দেড়টা থেকে দু’টো, সাড়ে ছ’টা থেকে পৌনে সাতটা। তখন হত ম্যানেজমেন্টের ক্লাস। ঐ সুনীলবাবুই নিতেন। সত্যিই, কত কী যে শেখা বাকি রয়ে গেল!

অ্যাকশন। অ্যাকশন। অ্যাকশন।

সুনীলবাবুকে সরাসরি রিপোর্ট করতেন অনীশ দাস। তাঁকে একরকম সুনীলবাবুর ডানহাতই বলা চলে। অনেক মানুষ দেখেছি, ঘুমকে এভাবে ঘেন্না করতে কাউকে দেখিনি। ইন্ট্রোফার্মের কেউ ঘুমোনোর জন্য বাড়ি গেছে শুনলে সেই ঘেন্না তাঁর চোখেমুখে ফুটে উঠত। ক্ষমতা থাকলে তিনি হয়ত ঘুমন্ত মানুষ দেখলে ফাঁসির হুকুম দিতেন।

অ্যাকশন। অ্যাকশন। অ্যাকশন।

অফিসেই থাকতেন অনীশবাবু। অসম্ভব কর্তব্যপরায়ণ। স্ত্রীর পক্ষাঘাত, সাত সন্তান, কিন্তু বাড়ি যাওয়ার ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ ছিল না তাঁর। জিজ্ঞেস করলেই বলেন যে বিলাসিতার সময় নেই। কাজের ফাঁকে ফাঁকে জাভা, বটানি, আর স্প্যানিশ সাহিত্যে পিএইচডিও সেরে ফেলেছিলেন। নাহলে সময় নষ্ট হত।

অ্যাকশন। অ্যাকশন। অ্যাকশন।

একমাসের মধ্যেই আমি ন’টা ফোন বাগিয়ে ফেলেছিলাম। পরের মাসে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল দশে। তারপর ক্রমশঃ এগারো, বারো... তরতর করে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছিলাম।

অ্যাকশন। অ্যাকশন। অ্যাকশন।

একদিন অ্যাকশন অ্যাকশন করতে করতে দু’টো কিউবিকলের সারির মাঝখানের আইল দিয়ে হাঁটছিলেন সুনীলবাবু।

হঠাৎই পড়ে গিয়ে মরে গেলেন।

অসম্ভব প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলাম, মনে আছে। অনীশবাবুর ডেস্কে ছুটে গিয়ে জানিয়েছিলাম ব্যাপারটা।

অনীশবাবুর তখন দু’কানে দু’টো মোবাইল রাবারব্যান্ড দিয়ে বাঁধা, দাঁতের ফাঁকে কলম, নোট নিয়ে চলেছেন সমানে, তার সঙ্গে দু’হাতে দু’টো কম্পিউটারে টাইপ করছিলেন। আর তার সঙ্গে পা দিয়ে চালাচ্ছিলেন সেলাই মেশিন।

অ্যাকশন। অ্যাকশন। অ্যাকশন।

গিয়ে সব বলেছিলাম।

“এবার আমরা কী করব তাহলে?” কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন অনীশবাবু।

“কেন, অ্যাকশন নেব!”

তা অ্যাকশন নিয়েছিলাম। ডেথ সার্টিফিকেট শবযাত্রা শ্মশান শ্রাদ্ধ নিয়মভঙ্গ ইনশিওরেন্স সমস্ত অ্যাকশন নিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলাম।

খুব খুশি হয়েছিলেন অনীশবাবু, মনে আছে।

স্মরণসভায় আমাকেই বলতে বলেছিলেন তিনি। আর সেদিনই বুঝেছিলাম যে স্মরণসভায় বক্তৃতা দেওয়ার দক্ষতা আমার সহজাত। অতএব ঝটপট অ্যাকশন নিলাম।

তারপর থেকে এটাই আমার পেশা। অনেক চেষ্টা করেছিলেন অনীশবাবু, তিরিশটা ফোন অবধি প্রোমোশন অফার করেছিলেন। শুনিনি।

তবে ইন্ট্রোফার্মের কথা মাঝেমধ্যে মনে পড়ে। পুরোনো অফিস, হাজার হোক।

তবে ইন্ট্রোফার্ম যে ঠিক কী করত সেটা কখনও জিজ্ঞেস করা হয়নি সুনীলবাবুকে। সাবানটাবান বানাত বোধহয়।

Thursday, August 15, 2019

নিশীথের কথা


মূল গল্প: The Boarded Window
লেখক: Ambrose Bierce
অনুবাদ নয়, “ছায়া অবলম্বনে”

-----

আরএ মিল্ক কলোনির দিকটায় বাড়ি নিশীথের। শোনা যায় আগে পুলিশে ছিলেন, কিন্তু ঠিক কী পোস্টে কাজ করতেন কেউ জানেনা।

শুধু এটুকু জানে যে নিশীথ হাসেন না। অন্ততঃ গত পঁচিশ বছরে কেউ তাঁকে হাসতে দেখেনি, সেই বিনীতা মারা যাওয়ার পর থেকেই। বয়স বোধহয় পঁয়ষট্টি, তবে নির্জীব চোখ, তোবড়ানো গাল, কোঁচকানো চামড়া, সব মিলিয়ে নব্বই মনে হলেও দোষের কিছু নেই।

দ্বিতীয়বার আর বিয়ে করেননি নিশীথ। ছেলেমেয়েও নেই। একতলায় ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে থাকেন অনেক বছর ধরে। বোরিভলি ন্যাশনাল পার্কের নাম তখনও সঞ্জয় গান্ধীর নামে হয়নি। এ চত্বরে তখন হরিণ শুধু নয়, রীতিমত প্যান্থার দেখা যেত। এখনও দেখা যায় অবশ্য, এমনকি আইআইটি ক্যাম্পাসেও, তবে সে নেহাৎই বছরে একবার। তখনকার মত নয়।

পাড়ার ছেলেগুলো একবার বল আনতে গেছিল গত বছর। দরজাটা কোনও কারণে খোলা ছিল, ঢুকেই পড়েছিল ছেলেগুলো। ওরাই বলল, ওয়ানআরকে ফ্ল্যাট, সেখানে তক্তপোষ আর একটা আলনা ছাড়া ফ্ল্যাটে আর কোনও আসবাব নেই। টিমটিমে একটা আলো, জানালাটা অবধি বন্ধ, আলনা দিয়ে ঢাকা।

বল অবশ্য চাওয়ামাত্র দিয়েছিলেন নিশীথ। তবে একটাও কথা বলেননি। ভয় না পেলেও খানিকটা ঘাবড়ে গেছিল ছেলেগুলো।

বিনীতার সঙ্গে নিশীথের বিয়ে হয়েছিল তিরিশ বছর আগে। এদিকটা তখন নতুন তৈরি হচ্ছে, ভাড়া না নিয়ে বেশ খানিকটা ঝুঁকি নিয়েই একটা ফ্ল্যাট কিনে ফেলেছিলেন। ছ’দিন নিরিমিষ, সপ্তাহে একদিন মাছ, আর রবিবার হয় গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া নয় সিনেমা – সব মিলিয়ে একজনের রোজগারেও দিব্যি চলছিল সংসার।

বিনীতার রান্নার হাত ছিল চমৎকার। মাঝেমধ্যে বসে ভাবেন নিশীথ। এত বছর পর স্বাদ মনে না পড়লেও রান্নাঘরে দাঁড়ানো বিনীতার স্মৃতিটা এখনও মুছে যায়নি।

কীই বা দিতে পেরেছিলেন বিনীতাকে তিনি? হাজার কষ্টের মধ্যেও কিন্তু হাসিমুখে থাকত মেয়েটা, মনে পড়ল নিশীথের। তিনি বরাবর চুপচাপ, কিন্তু দু’জনের ভাগের কথা একাই বলে চলত।

তবে বড্ড ভুগত। এমনিতে শক্তসমর্থ ছিল, অসম্ভব খাটতে পারত। কিন্তু বড্ড ঘনঘন জ্বর আসত।

আর জ্বরে ভুগে ভুগেই তো...

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নিশীথ।

ধুম জ্বর এসেছিল সেদিন বিনীতার। নিজের সীমিত জ্ঞান অনুযায়ী ওষুধ খাইয়ে, জলপটি দিয়ে হাওয়া করেও জ্বর নামেনি। শেষটায় তুলে দাঁড় করিয়ে মাথায় জল ঢেলে চান করিয়ে দিলেন নিশীথ। বিনীতা তখন প্রায় অবশ।

ফোনও ছিল না বাড়িতে। আর থাকলেও রবিবার ডাক্তার আসার প্রশ্নই ছিল না। আশেপাশে হাসপাতালও ছিল না, আর থেকেও বিশেষ লাভ হত না, কারণ সে রাতের মত বৃষ্টি এত বছরে আর দেখেননি নিশীথ।

উদ্‌ভ্রান্তের মত মিনিটকয়েক ঘুরে বাড়ি ফিরে আসেন নিশীথ। ততক্ষণে সব শেষ। ভেজা বেডশীটের ওপর পড়ে আছে বিনীতার নিথর দেহ।

পায়ে আর জোর পেলেননা নিশীথ। বসে পড়লেন মাটিতে।

রাত তখন এগারোটা। বৃষ্টি থামার নাম নেই। শ্মশানে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। আর কাকেই বা ডাকবেন এত রাত্রে?

চোখে জল আসাটাই হয়ত স্বাভাবিক ছিল নিশীথের, কিন্তু তার বদলে শরীর ভেঙে এল অবসাদ। বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়লেন একসময়।

ঘুমটা ভাঙল অনেক রাতে। ততক্ষণে কারেন্ট গেছে, ঘুটঘুটে অন্ধকার। স্পষ্ট বুঝতে পারলেন যে ঘরে কেউ আছে।

একটা খস্‌খসে আওয়াজ হল।

চোর?

বৃষ্টিটা বোধহয় একটু ধরেছে।

দরজাটা তো বন্ধ। জানালা দিয়েই ঢুকেছে তাহলে। অনেকবার বলেছিল বিনীতা শিক লাগাতে। শোনেননি।

তক্তপোষের দিকে কিছু একটা নড়ে উঠল না?

মাটিতে শুয়ে ঘষটে ঘষটে আলনাটার দিকে এগোলেন নিশীথ, চোখ তক্তপোষের দিকে। হাতড়ে হাতড়ে সার্ভিস রিভলভারটা পেলেন। ভাগ্য ভাল আওয়াজ হয়নি।

মাঝরাত্রে পুলিশের ঘরে কেউ ঢুকলে তাকে গুলি করা নিশ্চয়ই অপরাধ নয়। হতে পারে না।

আবার সেই খস্‌খসে আওয়াজটা। নড়াচড়াটা বিনীতার শরীরের কাছেই হল না?

গুলি চালালেন নিশীথ। ঝলসানিতে স্পষ্ট দেখতে পেলেন প্যান্থারটাকে পালাতে।

টর্চটা জ্বেলে প্রথমেই জানালাটা বন্ধ করলেন নিশীথ। তারপর গেলেন বিনীতার কাছে।

দু’টো ক্ষতচিহ্ন দেখতে পেলেন নিশীথ, গলায় আর বুকের কাছে। আর দেখতে পেলেন রক্ত, যে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল বিনীতার শরীর। আশ্চর্য, এত ঘণ্টা পরেও একটুও জমাট বাঁধেনি।

হাত দু’টোও এলিয়ে পড়ে নেই আর, বরং শক্ত করে মুঠো করা। হতভম্ব হয়ে বিনীতার মুখে টর্চ ফেললেন নিশীথ। তারপর এগিয়ে গেলেন, আরও অনেক অনেক অনেক কাছে, একদম মুখের সামনে।

বিনীতার দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা ছোট্ট কালো জিনিসটা কোনও জানোয়ারের কানের অংশ ছাড়া আর কিছু হতেই পারে না।

জানালাটা সেদিন থেকেই বন্ধ নিশীথের। আর খোলেননি।

Tuesday, August 13, 2019

প্রযুক্তি


মূল গল্প: Answer
লেখক: Fredric Brown
অনুবাদ নয়, “ছায়া অবলম্বনে”

-----

উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠলেন অদ্রীশ। স্ক্রীনের সামনে বসে থাকা কোটি কোটি – না না, আরও অনেক অনেক বেশি – দর্শকের মধ্যে সঞ্চারিত হল সেই উত্তেজনা।

এক হাজার বছরের গবেষণার ফল এই যন্ত্র। যাবতীয় পরীক্ষানিরীক্ষা শেষ। এবার শুধু একটা বোতাম টেপার অপেক্ষা।

আর তাহলেই ব্রহ্মাণ্ডে বাকি যতগুলো গ্রহে প্রাণের স্পন্দন পাওয়া গেছে, তারা সবাই চলে আসবে এক নেটওয়র্কে। পৃথিবী সমেত মোট বেয়াল্লিশটা গ্রহে তথ্যের আদানপ্রদানের জন্য আর বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না।

ছায়াপথের পশ্চিমপ্রান্তের সূর্য নামের নেহাৎই ম্রিয়মাণ একটা তারা থেকে পনেরো কোটি কিলোমিটার দূরের এই নীল-সবুজ গ্রহটাকে তেমন কেউ পাত্তা দিত না এতদিন। এবার দেবে, কারণ এই সার্ভার স্বাভাবিকভাবেই থাকবে পৃথিবীতেই।

চল্লিশ প্রজন্মের তপস্যা আজ সার্থক। মহাজাগতিক প্রযুক্তিযুদ্ধে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা এখন প্রশ্নাতীত।

সাফল্যের হাসি সুধীরের মুখেও। শেষ ছোঁয়াটুকু অদ্রীশের হাতে হলেও এই প্রজেক্টের কর্ণধার তিনিই।

খুব স্বাভাবিকভাবেই অদ্রীশ তাই সুধীরকে অনুরোধ করলেন বোতাম টিপতে।

স্ক্রীনে অচেনা কিছু চিহ্ন ফুটে ওঠার পর আস্তে আস্তে ব্লেকনিক তরঙ্গে সারা ব্রহ্মাণ্ডের কম্পিউটারে ফুটে উঠল, “হ্যালো, ওয়র্ল্ড।”

“পিং সাকসেসফুল,” বলে উঠল সার্ভার।

হাততালি দিয়ে উঠল গবেষণাগারের প্রত্যেকে।

“প্রশ্ন করুন, সুধীর।”

“প্রশ্ন? ও, হ্যাঁ। প্রশ্ন,” স্বভাবতঃই বিহ্বল সুধীর। “আসলে অনেক, অনেক বছর আগে থেকে ভেবে রেখেছি কী প্রশ্ন করব। দেখি, আমরা যে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি, কোটি কোটি কোটি কোটি সুপারকম্পিউটর মিলে তা পারে কিনা।”

“ঈশ্বর বলে কি সত্যিই কিছু আছে?”

ব্রহ্মাণ্ডের প্রত্যেকটা কম্পিউটারে ধ্বনিত হল সুধীরের প্রশ্নের অনুবাদ।

দশ সেকেন্ড কেটে গেল। কুড়ি।

তারপর নানান্‌ গ্রহের আকাশ ফালাফালা করে দিল রংবেরঙের বিদ্যুৎরেখা। এত জোরে বাজ পড়ল যে পুরু কাঁচের নিশ্ছিদ্র ল্যাবরেটরির ভেতরেও চমকে উঠলেন বৈজ্ঞানিকরা।

আর তারপর মেঘমন্দ্রস্বরে শোনা গেল, “এবার থেকে থাকবে।”

বুঝে উঠতে কয়েকমুহূর্ত লাগল সুধীরের। তারপর চিৎকার করে বোতামটা আরেকবার টিপতে গেলেন তিনি। শেষ চেষ্টা।

এবার সিলিংজুড়ে চমকাল বিদ্যুৎ। তারপর বাজ পড়ল ল্যাবরেটরিতে। ডেস্ক থেকে ওঠার সুযোগটুকুও পেলেন না সুধীর, অদ্রীশ, বা ঘরের অন্য কেউ।

প্রযুক্তির অন্ধকার শ্মশানে ভৌতিক নীল আলো জ্বেলে চলতে থাকল শুধু সার্ভারটা।

“হ্যালো, ওয়র্ল্ড।”

Monday, August 12, 2019

সুইচ


মূল গল্প: Button, Button
লেখক: Richard Matheson
অনুবাদ নয়, “ছায়া অবলম্বনে”

-----

পার্সেলটা অ্যামাজনের নয়। কে পাঠিয়েছে বারবার উল্টেপাল্টে দেখেও বুঝতে পারল না অগ্নি। কুরিয়র করতে গেলে সাধারণতঃ কে পাঠাচ্ছে খামের ওপর লিখতে হয়, কিন্তু এক্ষেত্রে সেসবের কোনও বালাই নেই। কুরিয়র সার্ভিসের নাম অবধি নেই।

তার ওপর আবার দু’জনের নাম আছে পার্সেলের ওপর। বিয়ের নেমন্তন্ন ছাড়া শেষ কবে দু’জনের নামে চিঠি বা পার্সেল এসেছে মনে করতে পারল না অগ্নি।

দু’জনের নামে এলে কি দু’জনের একসঙ্গে খোলা উচিত? নাকি একজন থাকলেই যথেষ্ট?

খুলতে গিয়েও থেমে গেল অগ্নি। থাক, আসুক মিত্রা, যা করার একসঙ্গেই করবে তারা।

*

একটা ছোট বাক্স। তার মধ্যে একটা নিরীহ দেখতে সুইচ। সুইচ মানে একেবারে বাড়ির দেওয়ালে সাদামাটা সুইচবোর্ডে যা থাকে, সেই সুইচ। শুধু সুইচ, তারফার নেই। ব্যাটারিও না। কোনও ব্র্যান্ডের নামও নেই।

তবে একটা ভিজিটিং কার্ডমার্কা জিনিস আছে বৈকি। তার ওপর শুধু একটা ফোন নম্বর লেখা, তাও আবার সতেরো সংখ্যার। শুরুতে ☏ না থাকলে এটা যে ফোন নম্বর তা বুঝতেও পারত না অগ্নি বা মিত্রা।

ব্যাপারটা কী?

পটাপট করে কয়েকবার সুইচটা টিপল মিত্রা। কিছুই হল না।

“একবার ফোন করে দেখি?”

“ফোন করে কী বলবি? আমাদের বাড়িতে একটা সুইচ এসেছে?”

“না, মানে...”

“কেউ ট্রোল করছে, অগ্নি।”

“ট্রোল?”

“তোর অফিসে নাহয় বন্ধুবান্ধব নেই, কিন্তু আমার অফিসে এসব পাবলিকের অভাব নেই।”

“ধরে নিলাম তোর অফিসের কেউ। কুরিয়র কোম্পানির নাম নেই। সেন্ডারের নাম নেই। একটা অদ্ভুত সুইচ। তারপর একটা ফোন নম্বর – ধরে নিচ্ছি এটা ফোন নম্বর – তাও আবার সতেরো ডিজিটের। ট্রোল করছে করুক, একটা মানে তো থাকবে?”

“ফোনের ব্যাপারটাই অদ্ভুত লাগছে। দশটা নম্বর ডায়ল করলেই তো হয় কানেক্ট করবে নয় ডাজ নট একজিস্ট বলবে।”

“করে দেখি?”

“দেখ্‌। একবার ডাজ নট একজিস্ট বললে কাটিয়ে দেব।”

*

“এই, বাজছে রে।”

এটা একেবারেই আশা করেনি মিত্রা।

“স্পিকারে দে।”

দিল অগ্নি।

“ফোন করার জন্য ধন্যবাদ। আপনার সুইচ এবার চালু হল। আপনার কল ট্রান্সফার করা হচ্ছে, লাইনে থাকুন।”

সুইচটার কথা প্রায় ভুলেই গেছিল ওরা। মিত্রা সবে হাত বাড়াতে যাবে, এমন সময় শুনতে পেল, স্পষ্ট মহিলাকণ্ঠে, “স্পিকারফোনে কথা বলছেন মানে ধরে নিচ্ছি আপনারা দু’জনেই আছেন।”

“হ্যাঁ।” “হ্যাঁ।”

“ধন্যবাদ। আর কেউ আছে সামনে?”

“না।”

“বেশ। তবে মন দিয়ে শুনুন। পার্সেলের মধ্যে একটা সুইচও ছিল। ওটার ব্যাপারে বলি এবার।”

“এক মিনিট দাঁড়ান। কে আপনি?”

“সেটা আপনার না জানলেও চলবে। আপাততঃ এইটুকু ধরে নিন যে পৃথিবীর কেউ নই – তবে ফোন নম্বর থেকে সেটা আশাকরি বুঝে গেছেন এতক্ষণে।”

ওরা না বুঝে থাকলেও তা নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য করল না।

“অল্প কথায় বলছি। এই সুইচটা টেপার কয়েকদিনের মধ্যেই আপনারা এক কোটি টাকা পাবেন।”

“সুইচ টিপলে এক কোটি? এটা কীধরনের ইয়ার্কি?”

“আমার কথাটা শেষ করতে দিন। টাকা ছাড়া আরেকটা ব্যাপারও আছে।”

চুপ।

“টাকাটা আপনারা পাওয়ার আগে আরেকটা ঘটনা ঘটবে।”

চুপ।

“কোনও একজন মারা যাবে সুইচ টেপার আধঘণ্টার মধ্যে। চিন্তার কিছু নেই, আপনার অচেনা কেউই মারা যাবে। কে মারা যাবে সেটা র‍্যান্ডমলি বাছা হবে, তবে ঐ, যা বললা, আপনাদের চেনা মহলের বাইরে।”

“মানে?”

“যা বললাম তাই। আপনি সুইচ টিপলে আপনার গ্রহে আপনার সম্পূর্ণ অচেনা কেউ মারা যাবে, আর তার পরে আপনি পাবেন এক কোটি টাকা।”

“কিন্তু...”

“কিন্তু?”

“আপনি ডব্লু ডব্লু জেকবসের নাম শুনেছেন?”

“এই ‘মাঙ্কিজ প’ নিয়ে প্রশ্নটা সবাই করছে কেন বলুন তো? ওটা কল্পনা, এটা বাস্তব। দু’টো এক হল?”

“কিন্তু অত টাকা...”

“ভাববেন না। ব্রিফকেসে ভরে ক্যাশ আসবেনা। এটা সত্তরের দশকের হিন্দি সিনেমা নয়। পুরো টাকাটাই ট্রান্সফার হবে। ট্যাক্স নিয়ে সমস্যা হবেনা। তবে হ্যাঁ, সুইচটা একবারই ব্যবহার করতে পারবেন।”

“কিন্তু কোনওভাবে যদি...”

“হঠাৎ করে কিছুতে লেগে সুইচ অন হওয়ার ভয় নেই। সুইচটা এখন অত সহজে কাজ করবেনা। প্রথমতঃ বেশ জোরে চাপ দিতে হবে, আর সেখানেই শেষ না। দশ সেকেন্ড ধরে রাখতে হবে।”

“আর যদি ব্যবহার করতে না চাই?”

“একদিন রেখে দিন। এই ফোনটা রাখার ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা পর সুইচটা ডিঅ্যাক্টিভেটেড হয়ে যাবে।”

“কিন্তু এতে আপনার কী লাভ?”

“ওঃ, আমার দরকার ডেটা। আপনাদের ঠিকানা র‍্যান্ডম স্যাম্পল হিসেবে এসেছে। আপনাদের গ্রহে মানুষ কীভাবে সাড়া দেয় সেসবের ওপর বেস করে একটা মডেল ফিট করার প্রজেক্ট আমার ফাইনাল সেমেস্টারে।”

মোবাইলের দিকে তাকাল অগ্নি। ন’টা বেজে সতেরো মিনিট বাইশ সেকেন্ড।

*

“কী করবি, অগ্নি?”

“কী করব মানে? এই প্রশ্নটা আসছে কীভাবে?”

“না মানে ভাব্‌, এক কোটি টাকা। এক কোটি। কটা শূন্য বল্‌ তো?”

“তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে মিত্রা?”

“না দেখ্‌, আমরা তো জানতেও পারব না কে মারা যাচ্ছে। মানে যদি দিনক্ষণের হিসেবও করি তাহলেও প্রতি মিনিটে পৃথিবীতে কত মানুষ মারা যাচ্ছে জানিস? যদি জানতেও পারি কেউ ঐ সময়ে মারা গেছে, কীভাবে জানব তার মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী?”

“না, তোর সত্যিই মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তুই টাকার জন্য খুন করতে চাইছিস্‌।”

“ড্রামাটাইজ করিস্‌ না। তুই জানতেও পারবি না। যে মারা যাবে সে হয়ত এমনিই মারা যাচ্ছিল, না খেতে পেয়ে বা অসুখে ভুগে, অ্যামেরিকা অ্যাফ্রিকা ইয়োরোপ কোথাও একটা।”

“সেটা পয়েন্ট না। আমার মনে হয়না কারুর অধিকার আছে অন্যকে মারার।”

“এক কোটি টাকা, অগ্নি। এক কোটি। ভাবতে পারছিস্‌?”

“তোর সিরিয়সলি মাথা গেছে। একজন মারা যাবে। ধর্‌ এই পাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চাদু’টো...”

“চেনা কেউ হবেনা, অগ্নি। অচেনা হবে, বলেছে তো। একদম অচেনা।”

“কিন্তু ওদের মত কেউ হতে পারে, তাই না? ধর্‌ এই বিল্ডিঙেই হল। সবকটা ফ্ল্যাটের সব বাচ্চাকে চিনিস তুই?”

“তোর মনে হয় সেটা সম্ভব? পৃথিবীর পপুলেশন জানিস্‌? আমাদের বিল্ডিঙে কেউ মারা যাওয়ার প্রব্যাবিলিটি হিসেব কর্‌।”

“তুই পয়েন্টটা মিস্‌ করছিস্‌ মিত্রা। এই বিল্ডিঙের কেউ নাও হতে পারে। ধর্‌ অন্য কেউ। ধর্‌, বাচ্চাও নয়। ধর্‌, তার টাকায় সংসার চলে। বা যদি তা নাও হয়, একটা লোককে মেরে ফেলব, জাস্ট টাকার জন্য?”

*

মিত্রা যে খুশি হয়নি সেটা হাবেভাবে বুঝেছিল অগ্নি। কিন্তু বদ্ধ পাগল না হলে কেউ এধরনের প্রস্তাবে রাজি হয়না। কাল রাত্রে বেশ অবাকই হয়েছিল অগ্নি। যাক্‌, আপাততঃ যে বুঝেছে এতেই শান্তি।

হোক না এক কোটি টাকা।

নানান্‌ মিটিঙে স্লাইডের দিকে সারাদিন মোটামুটি ঘুমিয়ে কাটাল অগ্নি। সুইচটার কথা ভুলেই গেছিল। ফ্ল্যাটে ঢুকে আলো জ্বালার মনে পড়ল।

ডিনার সেরে ফিরবে মিত্রা। বারোটা হবে। এখন সাড়ে আটটা।

এক কোটি টাকা। সাতটা শূন্য।

ক্যালকুলেটর খুলে মাইনের অঙ্কটা দিয়ে ভাগ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল অগ্নি। অনেক, অনেক বছর লাগবে।

টাকার প্রতি মানুষের চাহিদা থাকাটা স্বাভাবিক। তবে অর্থলোভ বলতে যা বোঝায় সেটা অগ্নির মধ্যে কোনওদিনই ছিল না। বড় চাকরি দু’জনের কেউই করে না। যা রোজগার তাতে আইনক্স হয়ে গেলেও পপকর্নটা গায়ে লাগে। মন্দারমণি ছাড়িয়ে বড়জোর টাকা জমিয়ে আন্দামান হতে পারে, বালি বা কম্বোডিয়া নয়।

এতে অগ্নির অসুবিধে না হলেও মিত্রার হয়। প্রকাশ করে না ঠিকই, কিন্তু হাবেভাবে বোঝা যায়। কাল রাত্রে বড্ড বেশিই মনে হচ্ছিল।

টাকার জন্য কতটা ডেস্পারেট হলে মানুষ খুন করতে পিছপা হয়না?

খুন?

খুনই তো। জানতে না পারলেও খুন তো খুনই, তাই না?

এত টাকার দরকার কীসের? গোটা জীবন তো পড়ে আছে রোজগার করার জন্য। আজ না হলেও আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু মিত্রা আজই চায়। এক্ষুনি।

স্কুলের বন্ধুদের খানিকটা হিংসেই করে মিত্রা। ইন্সটাগ্র্যামে বন্ধুদের ছবি দেখে মন্তব্য করে কার কার বাবা বড়লোক। বরের টাকার কথাটা বলে না বটে, কিন্তু অগ্নি নিশ্চিত যে মনে মনে ভাবে।

ভাল লাগে না অগ্নির। এতটা ছিল না বিয়ের আগে, মনে পড়ল।

ধুর্‌, এত কেন ভাবছে অগ্নি? ন’টা বাজে, এবার চানটান করে খাবার গরম করলে বরং কাজে দেবে।

ন’টা বাজে। ন’টা।

আর সতেরো মিনিট বাইশ সেকেন্ড। না, বাইশ সেকেন্ড নেই আর।

সুইচটা হাতে নিয়ে ঠায় বসে রইল অগ্নি, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে।

নিজের টাকার লোভ নেই ঠিকই, কিন্তু ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স একটা তৈরি হয়েছে বৈকি বিয়ের পর। এই যে পদে পদে মিত্রার চাহিদা, এক কোটি টাকা পেলে সেটা অনায়াসে মিটে যাবে, তাই না?

বালি-কম্বোডিয়া কেন, অ্যালাস্কা ক্রুজও হয়ে যাবে।

কিন্তু একটা নিরীহ মানুষকে...

ন’টা পাঁচ।

প্রব্যাবিলিটির কথা বলছিল না মিত্রা? পৃথিবীর কত লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকে। মরতে চাইলেও মরতে পারে না, মনের জোর পায়না।

তাদের একজন মরতে পারে আজ। হতেই পারে। আর মরলেই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এক কোটি টাকা।

ন’টা দশ।

খুব অন্যায় হবে সুইচটা টিপলে? নিজের তো দরকার নেই টাকার। এটা তো মিত্রার জন্য করছে সে। মিত্রাকে খুব ভালবাসে অগ্নি।

অচেনা কেউ। আজ অপরাধবোধ হলেও কতদিন মনে থাকবে? তিনমাস? ছ’মাস? একবছর? তারপর?

মিত্রা খুব চায় টাকাটা। খুব তাড়াতাড়ি জীবনে অনেক কিছু করে ফেলতে চায়।

ন’টা পনেরো।

মিত্রার মুখটা মনে পড়ল অগ্নির। জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে টাকা জমা পড়লে মেসেজটা দেখে মিত্রার মুখ কীভাবে উদ্ভাসিত হবে জানে সে। অনেকদিন তাকায়নি মিত্রা ঐভাবে।

অচেনা তো। হবেনা কিছু। জানতেও পারবেনা কোনওদিন।

ন’টা বেজে ষোল মিনিট বাইশ সেকেন্ডের মাথায় সুইচটা টিপল অগ্নি। দশ সেকেন্ডের বেশিই ধরে রইল।

*

“আপনার নামে এফআইআর করব আমি।”

“আপনি জানেন তাতে লাভ নেই। আমি আপনাদের গ্রহের হলেও কিচ্ছু প্রমাণ করতে পারতেন না আপনি। অ্যাক্সিডেন্ট ছিল। আর হ্যাঁ, আপনি ইনশিওরেন্সের এক কোটি টাকা পাননি?”

“আপনি বলেছিলেন অচেনা কেউ। আপনি কথা দিয়েছিলেন।”

“পার্সেলটা পাওয়ার আগে অবধি আপনি সত্যিই চিনতে পেরেছিলেন আপনার স্ত্রীকে?”

Followers