BANNER CREDITS: RITUPARNA CHATTERJEE
A woman with the potential to make it big. It is not that she cannot: she simply will not.
PHOTO CREDITS: ANIESHA BRAHMA
The closest anyone has come to being an adopted daughter.

Monday, November 5, 2012

ণত্ব-বিধান

ষত্ব-বিধানের লেখা এইখানে

***

আজ, ২০১২ খ্রীষ্টাব্দের নভেম্বরের এই সকালে বসে ণ্‌-এর কথা ভেবে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। আরো হল, কারণ ণ্‌-কে নিয়ে কেউ খুব একটা চিন্তিত নয়; আজ যদি বাংলা ভাষা থেকে ণ্‌ সর্বৈবভাবে লুপ্ত হয়ে যায় (ঠিক যেমন  বেচারার ক্ষেত্রে হয়েছে), সমস্ত ণ্‌-এর জায়গায় হঠাৎ ন্‌ ব্যবহার শুরু হয়, মনে হয় না তাতে কারুর বিশেষ হেলদোল হবে। ণ্‌ অনেকটা দুয়োরানীর মত - তার অস্তিত্ব সম্পর্কে সবাই ওয়াকিবহাল, কিন্তু তার ব্যবহারে কেউ খুব একটা ইচ্ছুক নয়।

একেবারে উচ্চারণ দিয়েই শুরু করি। অন্ততঃ নব্বই শতাংশ বাঙালির উচ্চারণে ণ্‌ হল "মোদ্ধেন্ন"; বাকিরা, যারা একটু বিশুদ্ধবাদী, তাঁরা বলেন "মূর্ধন্য"; সমস্যা হল, দুটোই ভুল।

"মূর্ধন্য" মানে হল "মূর্ধা সম্বন্ধীয়"; বর্ণের ক্ষেত্রে মূর্ধন্য মানে হল "যা উচ্চারণ করতে মূর্ধা ব্যবহার করতে হয়" - যেমন ট্‌ ঠ্‌ ড্‌ ঢ্‌। মূর্ধা কথার আসল মানে মাথা হলেও এক্ষেত্রে "মুখের ছাদ", অর্থাৎ ট্‌ উচ্চারণ করার সময় জিভ যেখানটায় ঠেকে।

মূর্ধায় ঠেকিয়ে যে বর্ণ উচ্চারণ করতে হয় তাকে বলে মূর্ধন্য, যেমন ট্‌ ঠ্‌ ড্‌ ঢ্‌ ণ্‌। এর মানে হল, মূর্ধন্য আসলে বিশেষণ; ণ্‌-এর আসল নাম "মূর্ধন্য ণ" (হ্যাঁ, পুরো কথাটাই, শুধু মূর্ধন্য নয়); মজার ব্যাপার, আমাদের উচ্চারণে ণ্‌ আর ন্‌-এ কোনো পার্থক্য না থাকলেও হিন্দিতে ণ্‌ উচ্চারণ করার সময় মূর্ধায় ঠেকানো হয়, যার ফলে ণ-এর উচ্চারণ হয় অনেকটা ড়ঁ-এর মত।

বাংলায় মূর্ধন্য ণ-এর আকৃতি দেবনাগরীর থেকে অনেক বলিষ্ঠ। আমাদের ণ মোটেই ওদের মত নুইয়ে-পড়া হাড়জিরজিরে নির্জীব ক্লীব নয়, রীতিমত শাঁসে-জলে চেহারা তার, তার উন্নতশির অস্তিত্বে বাংলা ভাষার সম্পদ আজ বহুগুণে বর্ধিত। চেহারা দেখলেই বোধগম্য হবে -
বনাম 
দেবনাগরীর ण একটা অদ্ভুত ন্যাতানো, মাথা-নোয়ানো, কেলিয়ে-পড়া ক্লীববিশেষ; যেখানে আমাদের ণ্‌ অনেক বলিষ্ঠ, উন্নতশির, ঋজু মেরুদণ্ডের অস্তিত্ব। তাও আমরা মূর্ধন্য ণ্ এবং তার ব্যবহার সম্পর্কে রীতিমত উদাসীন।

উচ্চারণগত পার্থক্য (যা আমরা আদৌ মানি না) ছাড়াও ন্এর মাত্রা আছে, যা ণ্এর নেই। ণ্‌ হামেশাই ট্‌ ঠ্‌ ড্‌ এর সঙ্গে যুক্ত হয়, ন্‌ও। ণ্‌-যুক্ত যুক্তাক্ষরের চেহারা ন্‌যুক্ত যুক্তাক্ষরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা -
ণ্‌ যোগ করলে হয় ণ্ট ণ্ঠ ণ্ড, সবকটাই মাত্রাবিহীন
ন্‌ যোগ করলে হয় ন্ট ন্ঠ ন্ড, সবই মাত্রাযুক্ত

ণ্‌ দিয়ে সাধারণতঃ শব্দ শুরু হয় না। ণিচ্‌ নামে একটা প্রত্যয় আছে অবিশ্যি, যা ব্যবহার হলে সেই ক্রিয়াপদকে ণিজন্ত ক্রিয়া বলে। কিন্তু এছাড়া ণ দিয়ে শুরু কোনো শব্দ অভিধানে নেই।

তাহলে ণ্‌ কখন কোথায় ব্যবহার হয়? কেন হয়? তা নিয়ে রীতিমত নিয়মটিয়ম আছে, যার নাম ণত্ব-বিধান। ণত্ব-বিধান অবশ্যই আরেকটা ণ্‌ দিয়ে শুরু শব্দ, কিন্তু এর মধ্যে একটা জালি আছে। এটা গায়ের জোরে ণ্‌ দিয়ে শুরু শব্দ।

ণত্ব-বিধান বাংলা ব্যাকরণের অন্যতম ঘ্যাম জিনিস। মন দিয়ে একবার শিখে নিলে বাংলা বানান ভুলের সংখ্যা অর্ধেকের নিচে নেমে আসবে।

১) ঋ র্‌ ষ্‌ থাকলে তার অব্যবহিত পরে অবশ্যই ণ হবে, ন নয়। যেমন ঋণ, স্বর্ণ, উষ্ণ। বিদেশী শব্দে অবশ্য এর প্রয়োজন নেই, যেমন হর্ন, কর্ন, পর্নো।

উদাহরণ -
ট্রাক-ড্রাইভারেরা হর্ন বাজিয়ে তাদের নতুন সভাপতিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল।
পর্ণকুটিরে বসে সজোরে পর্নোগ্রাফিক ভিডিও দেখলে প্রতিবেশীরা আপত্তি জানাবেই।

২) ঋ র্‌ ষ্‌ এর পর (যতগুলো ইচ্ছে) স্বরবর্ণ, ক-বর্গ, প-বর্গ, ব্‌, হ্‌, ং থাকলে ণ হবে। যেমন কারণ, শ্রবণ, শ্রমণ, ম্রিয়মাণ। আবার, বিদেশী শব্দে এর প্রয়োজন নেই, যেমন কার্বন, হ্যারিকেন।

উদাহরণ -
কানের খুব কাছে বৃংহণ শুনলে অনেকেরই হাতে হ্যারিকেন হয়ে যায়।
কার্বন ডাইঅক্সাইড শোঁকার নেশা হলে মরণ আসন্ন।

৩) ট্‌-বর্গের বর্ণের অব্যবহিত আগে (একই বর্গের বর্ণ বলেই মনে হয় একটা আঁতাত আছে) ণ্‌ বসবে। যেমন ঘণ্ট, লুণ্ঠন, ষণ্ড। বিদেশী শব্দে এর প্রয়োজন নেই, যেমন মাউন্ট, রাউন্ড, ব্লাইন্ড।

উদাহরণ -
মাউন্ট এভারেস্ট ঘণ্ট রান্নার পক্ষে খুব সুবিধের জায়গা নয়।
এক পাউন্ড ষণ্ডমাংস খেলে কারুর জাত যায় না।

৪) প্র, পরা, পরি, নির্‌ উপসর্গের পর ণ হয়। যেমন প্রণব, পরায়ণ, পরিণাম, নির্ণয়। আবার নিপাতনে সিদ্ধ উদাহরণও আছে, যেখানে ন-ই থেকে যায়, যেমন প্রনষ্ট, পরিনির্বাণ, নির্নিমেষ।

উদাহরণ -
ঊর্ধতন কর্মচারীর স্ত্রীর দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে পরিণাম সুবিধের হয় না।
পরিনির্বাণ আয়ত্ত করলে সবাই ঢিপ্‌ ঢিপ্‌ করে প্রণাম করে।

৫) প্র পরা পরি নির্ উপসর্গ বাদে সমাসবদ্ধ পদের দ্বিতীয় শব্দের ন্‌ থেকে যায়। যেমন সর্বনাম, পবননন্দন, দুর্নীতি। এখানেও নিপাতনে সিদ্ধ উদাহরণ আছে, যেখানে ণ্‌ হয়ে যায়, যেমন রামায়ণ, শূর্পণখা, অগ্রণী। অবিশ্যি আজকাল শূর্পনখা বানান দিব্যি চলে।

উদাহরণ -
মুখপোড়া পবননন্দন ও নাককাটা শূর্পণখার বিয়ে হলে রাজযোটক হত।
দুর্নীতির জগতে অগ্রণী হয়ে ওঠার মধ্যে একটা ঘ্যাম ব্যাপার আছে।

৬) ত্‌ থ্‌ দ্‌ ধ্‌ এর আগে ন্‌ ব্যবহার হয়। যেমন শান্ত, গ্রন্থ, ক্রন্দন, বন্ধন।

উদাহরণ -
অনর্গল ক্রন্দনরত বালকদের স্থূলকায় গ্রন্থ দ্বারা প্রহার করলে তারা শান্ত হয়।
অক্টোপাস-শুণ্ডের বন্ধন অত্যন্ত মন্দ।

৭) কিছু শব্দে এমনিই ণ হয়। যেমন অণু, আপণ (আপন অন্য শব্দ), কঙ্কণ, কণা, কণিকা, কল্যাণ, কোণ, গণ, গণ্য, গৌণ, ঘূণ, চিক্কণ, তূণ, নিপুণ, পণ, পাণি, পুণ্য, বণিক, বাণ, বাণিজ্য, বাণী, বিপণি, বীণা, বেণী, বেণু, ফণা, ফণী, লবণ, লাবণ্য, শণ, শোণ, শোণিত, স্থাণু।

উদাহরণ -
বেণুতে ঘূণ ধরলে জঘন্য শব্দ বেরোয়।
তূণের ভেতর রাখলে বাণের লাবণ্য বাড়ে।

৮) শব্দের শেষে (হসন্ত-সমেত) বসলে ন্‌ হয়। যেমন শ্রীমান্‌।

উদাহরণ -
শ্রীমান্‌ ফরদীন খান অভিনয় করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন।

Followers